সিকিম এর দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের খুঁটিনাটি

আমরা চ্যাংড়াবান্ধা পোর্ট দিয়ে যাই। আমরা জানতাম ২০ তারিখ বাসের টিকেট পেতে কস্ট হবে। কারন, ২১শে ফেব্রুয়ারির বন্ধের সাথে শুক্রবার,শনিবারের ৩ দিনের বন্ধ আছে। আবার,চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডার দিয়ে এই বন্ধে অনেকে ভূটান,দার্জিলিং, সিকিম যাবে। মানে টিকেট পেতে মোটামুটি একটা যুদ্ধ করা লাগবে। আর আমরা যুদ্ধ পছন্দ করি না। তাই জানুয়ারির ২৯ তারিখ এক বন্ধু কল্যানপুর বাস কাউন্টার গিয়ে খবর দেয় ২০ তারিখ কোনো বাসের টিকেট নাই। শুভ বসুন্ধরা নামক একটা বাসের টিকেট আছে, তাও মোটামুটি পিছনের সিট। আশিকুর কারো সাথে যোগাযোগ না করে ৯ জনের টিকেট করে ফেলে, আমাদের সাতজনের সাথে আমাদের বন্ধু তার বউকে নিয়ে যাবে। আসলে তাদের কাশ্মীর যাওয়ার কথা। কিন্তু কাশ্মীরের গন্ডগোলের জন্য তারা আমাদের সাথে সিকিম যাবে।

অপেক্ষা করতে থাকি ২০শে ফেব্রুয়ারির। অবশেষে আসে সেই ২০শে ফেব্রুয়ারি। আমাদের বাস রাত ৯ টায় গাবতলী থেকে। যেহেতু পরের দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি তাই রাস্তায় অনেক জ্যাম। সবার সাথে কথা বলে বিকাল ৫ টায় রওনা করি। নিউ মার্কেট, মোহাম্মদপুরের রাস্তা দিয়ে জ্যাম বেশি হতে পারে, তাই আমরা বাবুবাজার থেকে যে রাস্তা দিয়ে গাবতলী যাওয়া যায় ওই রাস্তা দিয়ে রওনা করি। কিন্তু বাবুবাজারেই বসে থাকি টানা ৪৫ মিনিট। উবার থেকে নেমে বাবুবাজার ঘাট থেকে নৌকা দিয়ে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত যাই। সেখান থেকে ভেংগে ভেংগে বাস কাউন্টারে যাই।

সাভার, ধামরাই কমপক্ষে ৪ ঘন্টা জ্যামে বসে থাকি। বুড়িমারি স্থলবন্দর পৌছাই সকাল ১১ টায়। বর্ডারে প্রচুর ভিড়। আমাদের প্ল্যান ছিলো আমরা ২১ তারিখই গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে রওনা করবো। বর্ডার ক্রস করতে করতে দুপুর ২টা বেজে যায়। (মানি এক্সচেঞ্জ নিয়ে শেষের দিকে বলে দিচ্ছি)। যেহেতু ওইদিন অনেক ভিড় ছিলো তাই জিপ গাড়ির সল্পতা। একটা জিপ গাড়িও ছিলো না। মানুষ ৯ জন। আমরা সময় নস্ট না করে অটো নিয়ে চলে যাই বাইপাসে। সেখানে ঘন্টাখানিক অপেক্ষা করার পর পাবলিক বাসে আমাদের ব্যাগ,বোঝা নিয়ে উঠে পরি। না! আজকে আর গ্যাংটক যাওয়া হবে না। গ্যাংটকে যাওয়ার জন্য সিকিম বর্ডারের রাংপো চেকপোস্ট থেকে এন্ট্রি করা লাগে। আর রাংপো চেকপোস্ট খোলা থাকে রাত ৮ টা পর্যন্ত। শিলিগুড়িতেই রাতে থাকবো আজকে। রাতের খাবার খেয়ে হটেলের ফেরার সময় শিলিগুড়ি জংশনের সামনে থেকে গ্যাংটক যাওয়ার জন্য গাড়ি ঠিক করে ফেলি। (শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক যাওয়ার জন্য গাড়ি ঠিক করার একটা টেকনিক শেষের দিকে বলে দিচ্ছি)

গাড়ি আসবে ভোর ৫ টায়। সময় মতই রওনা করি। রাংপো চেকপোস্ট পৌছাই সকাল ৮.০৫ মিনিটে। ১০ মিনিটেই এন্ট্রি করে ফেলি। গ্যাংটক পৌছে হোটেল নিয়ে ৩০ মিনিটের মধ্যে বের হয়ে পরি বাছাই করা কিছু জায়গা ঘুরার জন্য। আরেক কথা, গ্যাংটক ঘুরার জন্য ট্রাভেল এজেন্ট আমাদের সবার এক বড় ভাই আগেই ঠিক করে রেখেছিল। আমরা ট্রাভেল এজেন্টের সাথে কথা বলে, যাচাই বাচাই করে নর্থ সিকিম ঘুরার পার্মিটের জন্য উনাকে আমাদের পাসপোর্টের, ভিসার একটা ফটোকপি এবং একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে দেই। কারন পরের দিন আমরা নর্থ সিকিম যাবো। (ট্রাভেল এজেন্ট সম্পর্কে শেষের দিকে বলে দিচ্ছি)

Image may contain: sky, mountain, train and outdoor

সিটি ট্রিপের মধ্যে ছিলো গ্যাংটক রোপওয়ে (ক্যাবল কার), ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন, তাসি ভিউ পয়েন্ট সহ আরো ২/৩ টা জায়গা। সন্ধ্যার দিকে লাল বাজারে হালাল হোটেল খুজতে খুজতে পেয়ে যাই “আসলাম বিরিয়ানী” নামক এক কাশ্মীর দম্পতির হোটেল। মালিক জনাব আসলাম। মানুষটা যেমন অমায়িক তেমন উনার হোটেলের খাবারও অনেক মজার। আপনারা গেলেই বুঝবেন। ট্রাভেল এজেন্টের সাথে রাতে কথা বলি, উনি বলেন সকাল ১০.৩০ এ আমাদের গাড়ি। আমরা লাচেন এবং লাচুং এর জন্য ২ রাত ৩ দিনের প্যাকেজ নেই। ৭ জনের ৯/১০ টা ব্যাগ নিয়ে আমরা ঘুরাঘুরি করতে ইচ্ছুক না। মোটা জ্যাকেট, ট্রাউজার,হাতমোজা, কানটুপি ইত্যাদি নিয়ে নেই। ৭ জনের জন্য ৪ টা ব্যাগ। আর বাকি ব্যাগগুলো রেখে দেই হোটেলের লকারে। কারন গ্যাংটক ব্যাক করে আবার এই হোটেলেই থাকা লাগবে।

পরের দিন সবাই সকাল সকাল ব্যাগ প্যাক করে রেডি। রওনা করি সময় মতই। লাচুং যাওয়ার সময় রাস্তায় কয়েকটা ঝর্না, তিস্তা নদীসহ আরো কিছু সুন্দর জায়গায় ১০/১৫ মিনিটের ব্রেক নেই। যতই লাচুং এর সামনে যেতে থাকি ততই ঠান্ডার প্রকোপ বাড়তে থাকে। যাওয়ার পথে একটা ৭০০ মিটারের টানেল দিয়ে যাই। সন্ধ্যা হয়ে যায় লাচুং পৌছাতে। একে তো ঠান্ডা, তার উপর আবার বৃস্টি হচ্ছে। গ্যাংটকে তাপমাত্রা ছিলো ৫ ডিগ্রী, লাচুং এ ২/৩ ডিগ্রী যা রাতে হবে -৩/৪। থাকার হোটেল আর ৩ বেলা খাবার প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। রাতের খাবার খাই ভেজ আইটেম। মুরগী ছিলো, কিন্তু খাইনি। রাতে ড্রাইভার জনাব লাকপার সাথে আড্ডা দিতে দিতে কাটাও যাওয়ার জন্য প্ল্যান করে ফেললাম। কাটাও আমাদের প্যাকেজের মধ্যে ছিলো না। আমরা বলে দেই, যে পর্যন্ত গাড়ি যায় ওই পর্যন্ত যাবো। সম্ভব হলে গাড়ি থেকে নেমে হেটে হেটে যাবো। আবার সেই ভোর ৫টায় বের হওয়া লাগবে। রাতে ২.৩০ মিনিটে ঘুমিয়ে জেগে উঠি ভোর ৪.৩০ মিনিটে। ড্রাইভারকে কল দিয়ে জাগাই। কিছুটা আলো ফুটার সাথে হোটেলের জানালা দিয়ে বরফে ঢাকা পাহাড় দেখি। আর দেরি করা যাবে না।

Image may contain: sky, mountain, outdoor and nature

নাস্তা খাবো কাটাও থেকে আসার পর। সবাই বের হয়ে পড়ি।
কাটাও যেতে ঘন্টা দেড়েক লাগে। যতই কাটাও এর কাছে যেতে থাকি ততই সবুজ রঙের পরিমান কমতে থাকে। প্রথমে দেখি রাস্তার দুধারে জমে থাকা বরফ, কিছুদুর পর দেখি কিছু কিছু গাছের পাতা বরফে সাদা হয়ে গেছে, আরেকটু সামনে যেয়ে দেখি সব সাদা। মানে আপনার চোখ যত দূর যায় সবই সাদা। গাড়ি থেকে সবাই নেমে বরফে লাগালাগি, ঝাপাঝাপি, ছোড়াছুড়ি করতে থাকি। আমরা কাটাও থেকে ৫/৬ কিলোমিটার আগেই নেমে গিয়েছিলাম। কারন গাড়ি আর সামনে যাবে না। নো প্রব্লেম। পা আছে। ভিতরের দিকে হাটতে শুরু করি সবাই। পায়ে যতটুকু জোড় ছিলো তা দিয়ে ১ কিলোমিটার কম-বেশি যেতে পেরে ছিলাম। যাক এখন বের হয়ে যাই। হোটেল গিয়ে নাস্তা করে আবার ইয়ামথাং ভ্যালী যাওয়া লাগবে। হোটেল গিয়ে নাস্তা করে সাথে সাথে আমাদের ব্যাগ, বস্তা নিয়ে বের হয়ে যাই ইয়ামথাং এর উদ্দেশ্যে। ইয়ামথাং যাওয়ার আগে এক জায়গায় ড্রাইভার মিঃ লাকপা আর্মি অফিস থেকে এন্ট্রি করে নেয়। একটা কথা বলে রাখি, অনেক সময় ড্রাইভার অনেক চালাকি করে থাকে। যেমন, গাড়ি আর সামনে যাবে না, সামনের রাস্তা বন্ধ, পারমিশন নাই, গাড়ি স্লিপ করছে ইত্যাদি। আমরা আগে থেকেই এইসব চালাকি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে রেখেছিলাম। যক্ষনই ড্রাইভার বলেছে যে, সামনে আর যাওয়া যাবে না তক্ষনই আমাদের ৯ জন থেকে ৪/৫ জন একসাথে বলে উঠি, “ভাই যান, যাওয়া যাবে, অন্য গাড়িকে যেতে দেখেছি, না যেতে পারলে এখানে ৩/৪ ঘন্টা অপেক্ষা করেন, আমরা হেটে হেটে যাবো”। আমাদের সবার এমন কথা শুনে ড্রাইভার মোটামুটি কিছুটা বিরক্ত। ব্যাপার না। আমরা ঘুরতে এসেছি। সব না ঘুরে দেশে আসবো না। ড্রাইভার যে জায়গায় গাড়ি থামাতে চেয়েছিলো যে জায়গা মেইন ইয়ামথাং থেকে ৭/৮ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু আমরা না নেমে আরো সামনে যাই। দেড় দুই কিলোমিটার সামনে গিয়ে দেখি সত্যিই আর সামনে যাওয়া যাবে না। সব গাড়ি এই পর্যন্তই আসতে পারবে। গাড়ি থেকে নেমে এক আর্মির সাথে কথা বলি। “সামনে কি আর যাওয়া যাবে?” উত্তরে তিনি বলেন, “না। এই পর্যন্তই গাড়ি আসে, আপনারা চাইলে হেটে যেতে পারেন, কিন্তু বেশি দূরে যাবেন না”। ড্রাইভার বলে যে ২০/২৫ মিনিট থাকার জন্য। আমরা ৯ জন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ি। কিসের ২০/২৫ মিনিট। দেড় দুই ঘন্টা পর সবাই গাড়ির সামনে আসি। ড্রাইভার রাগ করে বসে থাকে। কিছুই বলে না।

ইয়ামথাং থেকে লাচেনের উদ্দ্যেশ্যে রওনা করি। লাচেন যাওয়ার ২১ কিলোমিটার আগে গাড়ি নস্ট হয়ে যায়। প্রায় ২/৩ ঘন্টা বসে থাকি। একতো ঠান্ডা, তার উপর আবার বৃস্টি। গাড়ি কোনো মতে ঠিক হয়, কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর আবার গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই। ড্রাইভার একটু উচু জায়গায় উঠে পাশের একটা গ্যারেজে সাহায্যের জন্য কল দেয়। পাশের গ্যারেজ বলতে মাত্র ৯/১০ কিলোমিটার দূরে। অন্য এক গাড়ির ড্রাইভারের সাহায্যে আমরা চুংথাং নামক একটা গ্রামে যাই৷ এখানেই সেই গ্যারেজ। সবাই ক্ষুধার্ত। গাড়ি থেকে নেমে ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন দিয়ে জানাই আমাদের অবস্থার কথা, সাথে এটাও বলি আমাদের দুপুরের খাবার ম্যানেজ করে দিতে। গ্যারেজের পাশেই একটা হোটেল ছিলো। ড্রাইভার লাকপা ট্রাভেল এজেন্টের কথায় ওই হোটেলে নিয়ে যায়। হোটেলের মালিক তিব্বতের। গাড়ি ঠিক হতে ঘন্টাক্ষানিক সময় লাগবে। আমাদের কোনো টেনশন নেই। আড্ডা শুরু করে দেই হোটেল মালিকের সাথে। দুপুরের খাবার নুডলস, তার সাথে পাচ বছরের পুরানো মরিচের তেল মাত্র এক ফোটা। যথেস্ট, চোখের কয়েক বালতি পানি বের করার জন্য। তিব্বতের ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিতে দিতে ড্রাইভার এসে বললো গাড়ি ঠিক হয়ে গেসে, এখনি বের হওয়া লাগবে। লাচুং পৌছাই রাত ৮ টায়। হোটেলটা ভালোই ছিলো। আন্ডারগ্রাউন্ডে ২ টা রুম আর দ্বিতীয় তলায় ১ টা রুম। আমিসহ ৪ জন উপরের রুমে থাকি। রাতের খাবার খেয়ে আমরা উপরের রুমের মেম্বাররা পরের দিনের প্ল্যান করতে থাকি। প্ল্যান শেষ করে আমি আর আশিক অযু করার জন্য ওয়াশরুমে যাই। গিজার অন করি। কিন্তু কল দিয়ে গরম পানি তো দূরের কথা ঠান্ডা পানিও আসতে আসতে পরছে। রিসিপশনের দিদিকে ডাক দেই। দিদি এসে আমাদের জানায় যে হোটেলের রিসার্ভ ট্যাংকের পানি বরফ হয়ে গেসে। উনি সকালে বালতিতে গরম পানি দিয়ে যাবে। আশিকুর তাড়াতাড়ি নিচের রুমে গিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয়, পানি আর খাবার বুঝে খাবার জন্য। না হলে টয়লেটে গেলে বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমাদের রায়হান ভাই টয়লেটে বসে আছে পানির অপেক্ষায়। সবাই হাসবো না কাদবো কিছুই বুঝতে পারছি না। যাক হোটেলের দিদি আমাদের খাদক জনাব রায়হানকে পানি দিয়ে বাচালো। রাতে তাপমাত্রা -২

Image may contain: sky, mountain, cloud, outdoor, nature and water

পর্যটকরা সাধারনত লাচেন যায় সিকিমের অন্যতম বিখ্যাত জায়গা “গুরু দুংমার লেক” এর জন্য। যেটা অনেকটা ইন্দিয়ার হিমাচল প্রদেশের “লাদাখ” এর মত। সিকিম সরকার গুরুদুংমার লেক যাওয়ার পারমিশন দেয় না ফরেনারদের। কিন্তু আমরা লাচেনের থাংগু ভ্যালী এবং চোপতা ভ্যালী যাবো। তারজন্য আমাদের আবার সেই ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠা লাগবে। আমরা উপরের রুমের মেম্বাররা ঘুমাই রাত ২ টায়। কিন্তু আমাদের জন্য নতুন একটা অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে। আমাদের সকলেরই একটা স্বপ্ন ছিলো স্নো ফল দেখবো। কিন্তু শিওর ছিলাম না। ভোর ৪.৪৫ মিনিট। আমাদের রুমের ৪ জনই ঘুম থেকে উঠে ঘুম ভরা চোখ নিয়ে রেডি হতে থাকি। এমন সময় বন্ধু জনাব রায়হান চিৎকার করে আমাদের রুমের জানালা খুলতে বললো। জানালা খুলে দেখি প্রচুর স্নো ফল হচ্ছে। “আলহামদুলিল্লাহ” আরেকটা স্বপ্ন আল্লাহ পূরন হলো। নিচে নেমে সবাই স্নো ফলের মজা উপভোগ করতে করতে ড্রাইভার এসে জানায় যে এখনি বের হওয়া লাগবে৷ না হলে রাস্তা বন্ধ হওয়ার সম্ভবনা আছে। আরো শিওর হওয়ার জন্য কয়েকজন কে জিজ্ঞেস করলাম যে থাংগু, চোপতা ভ্যালী যাওয়া যাবে কি না? উত্তরে তারা বলল, “আগে দেখেন গ্যাংটক যেতে পারেন কিনা?” রাস্তায় ৭/৮ সেন্টিমিটার বরফ জমে গেসে। খবর পেলাম কিছুক্ষন পর ইন্দিয়ান আর্মির গাড়ি যাবে এই রাস্তা দিয়ে। আর্মিদের গাড়ির চাকায় শিকল লাগানো। তো ওদের গাড়ি যাওয়ার পর রাস্তা কিছুটা পরিস্কার হবে। তার উপর আমাদের গাড়ির সামনের গ্লাসে বরফ পরে জমে গেসে, যার জন্য ওয়াইপার ঠিক মত কাজ করছে না। আমরা বড় ধরনের এক বিপদ অনুমান করতে পারলাম, কোনো মতে পাউরুটি,জ্যাম,কফি দিয়ে দাঁড়ানো অবস্থা নাস্তা করে বের হয়ে পড়লাম লাচুং সফর শেষ করে। আমরা চোপতা ভ্যালী, থাংগু ভ্যালী যেতে পারি নাই, কিন্তু কারো কারো চেহারায় কস্টের কোনো ছাপ নাই। জিজ্ঞেস করলাম, কারো কি কোনো আফসোস আছে? আমরা ঘুরতে পারি নাই? সবাই উত্তর দিলো, স্নো ফল দেখতে পেরেছি, সবাই খুশি। কোনো আফসোস নাই। হাসি মুখ নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে গাড়িতে উঠে পরি।

ড্রাইভারকে বলে দেই, যেহেতু আজকে লাচেনে ঘুরতে পারি নাই তাই রাস্তায় আমরা সুন্দর জায়গা দেখলেই ব্রেক নিবো। গ্যাংটক আসার সময় কয়েকটা জায়গায় ব্রেক নেই। গ্যাংটক পৌছাই বিকাল ৩.৩০ টায়। যেহেতু লাচেনের স্নো ফলের জন্য ঘুরতে পারি নাই, তো ওই ঘুরাটার ব্যাকাপ হিসেবে আরেকটা জায়গা যাওয়া দরকার। আমি আর আশিকুর একটা ব্যাকাপ প্ল্যানও করে ফেলি। সবাইকে জানাই না। ড্রাইভার লাকপার থেকে বিদায় নিয়ে সবাইকে হোটেলে পাঠিয়ে আমি আর আশিকুর চলে যাই গ্যাংটকের “দারুলিয়া ট্যাক্সি স্ট্যান্ড” এ। কারন আমাদের প্ল্যান সান্দাকফু যাবো। মানেভাঞ্জান থেকে সান্দাকফু যাবো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো ল্যান্ড রোভার দিয়ে। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে আমি আর আশিকুর দালালদের সিন্ডিকেটে পরে যাই। তখন আর গাড়ি রিসার্ভ না করে আমরা ডিরেক্ট হোটেলে চলে যাই। আমাদের আরেকটা প্ল্যান ছিলো যে, নর্থ সিকিমের ট্রিপ শেষ করে ইস্ট সিকিমের আরেকটা বিখ্যাত জায়গা “সাংগু লেক” যাবো। তখনও সাংগু লেক পুরাপুরি যাওয়া যায় না। বরফের জন্য রাস্তা অফ। গ্রুপের সবাইকে জানালাম, “এতোদিন তো বরফ দেখলাম, চল এখন ভিন্ন কিছু দেখি”। মানে সাংগু লেকের পরিবর্তে নতুন জায়গা। আর সবাইকে বলে দেই এইবার ছাংগু লেকটা বাদ দেই, আর আমাদের ড্রাইভার লাকপাসহ আরো কয়েকজনকে বলে আসি, যদি অদূর ভবিষ্যতে গুরুদুংমার লেক আর জুলুকের ” ওল্ড সিল্ক রুট” যাওয়া যায় তাহলে আমাদের জানানোর জন্য। পরের বার আসলে ছাংগুলেক সহ এইবার যেসব জায়গায় যেতে পারি নাই ওইসব জায়গাগুলোতে যাবো। (গ্যাংটক থেকে যেদিন বের হবো ওইদিনই ছাংগুলেক খুলে দিয়েছিলো, কিন্তু আমাদের প্ল্যান ততক্ষনে পরিবর্তন হয়ে সান্দাকফুর জন্য প্ল্যান করা শুরু করে দিয়েছি)

Image may contain: sky, tree, outdoor and nature

সবাই জানতে চাইলো প্ল্যান সম্পর্কে। সবাইকে বললাম, “পশ্চিম বংগের সবচাইয়ে উচু পাহাড় হচ্ছে সান্দাকফু আর এই পাহাড় থেকে হিমালয় রেঞ্জ দেখবো, দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু ৫টা পাহাড়ের ৪টাই দেখবো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো ল্যান্ড রোভার দিয়ে যাবো আর সান্দাকফুটা নেপাল আর ইন্ডিয়া এই দুই দেশের মধ্যেই পরেছে, মানে বিনা ভিসায় নেপালও ঘুরা হয়ে যাবে”। আহ!!!! দলের সাথী ভাইদের ঠিক এভাবেই জানালাম। কারন আমি,আশিকুর আর আশিক চাইনি যে আমাদের অন্য সাথী ভাইরা সান্দাকফুর প্ল্যানে দ্বিমত পোষণ করে। এমন ভাবে বলা লাগবে যাতে চিন্তা করার সময় না পায়। সবাই সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়। তার উপর এতো গুলা এচিভমেন্ট।আলহামদুলিল্লাহ। হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাই আমার আসলাম আংগেলের হোটেলে। আংকেল আমাদের দেখে খুশি। আংকেল উনার হোটেলের একটা স্পেশাল খাবার “ফালে” খাবার জন্য আমাদের বললো। ফালে জিনিসটা আমাদের দেশের পুলি পিঠার মত। ভিতরে গরুর মাংসের কিমা। রায়হাম মাত্র ৫টা ফালে খেলে ফেললো ১৫ মিনিটের মধ্যে। আংকেল আমাদের খাওয়া দেখে অবাক। “আংকেল বিফ মম দেন” আজকে খেয়ে শহিদ হয়ে যাবো। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আংকেল-আন্টির থেকে বিদায় নিয়ে সবাই চলে যায় এম.জি. মার্গে আর আমি,আশিকুর আর আশিক চলে যাই সেই “দারুলিয়া স্ট্যান্ডে”। কালকে সান্দাকফু যাওয়া লাগবে। আর সান্দাকফু যাওয়ার জন্য মানেভাঞ্জান যাওয়া লাগবে। রাত ৮ টা বাজে। জিপ স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখলাম বিকালের কয়েকজন দালাল দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমরা তিনজন দূরে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে থাকি। ওরা চলে যাওয়ার পর প্রবেশ করি জিপ স্ট্যান্ডে। পরিচয় হয় ” পিমবা দাদা” এর সাথে। উনার থেকে জিপ রিসার্ভ করি। ভাড়া ২৫০০ টাকা। কিন্তু দার্জিলিং পর্যন্ত যাবে। ওইখান থেকে মানেভাঞ্জানের গাড়ি সহজেই পাওয়া যাবে। সাথে দার্জিলিং শহরটাও কিছুটা ঘুরা হয়ে যাবে।পিমবা দাদা আমাদের জিজ্ঞেস করে “ভোর ৫ টায় গাড়ি হোটেলের সামনে যাবে, ঘুম থেকে উঠতে পারবেন তো?” আমরা তিনজন হাসতে হাসতে বলি “দাদা, গত ৫/৬ দিন ধরে তো ভোর ৪ টায় ঘুম থেকে উঠি, আপনার গাড়ি কি ৫ টায় আসতে পারবে কিনা তা বলেন?” বুকটা বড় করে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ দিয়ে দেই পিমবা দাদাকে। দাদা হাসতে হাসতে বলে যে, গাড়ি সময় মতই পৌছে যাবে। আমরা তিনজন চলে যাই এম.জি.মার্গে। সিকিম ট্রিপের আজকেই শেষ রাত। রাতের খাবার পার্সেল নিয়ে সবাই হোটেল চলে যাই।আমাদের সাথী ভাইরা জিজ্ঞেস করে সকালে কয়টায় বের হওয়া লাগবে? লজ্জা অথবা ভয়ে আমরা তিনজন চুপ করে একজন অন্যজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমাদের চুপ করে থাকা দেখে বিচক্ষন বন্ধু ইমন বলে উঠে, “বুঝতে পারসি, ভোর ৫টায় গাড়ি”। সবাই একসাথে হেসে উঠি। মানে এই ট্রিপে ভোর ৫ টা আমাদের জন্য সিগনেচার টাইম। সবাইকে জানিয়ে দেই যে, আমরা দার্জিলিং হয়ে যাবো, তো সবাই কিছুক্ষন দার্জিলিং শহরটা দেখতে পারবে। সবাই মহা খুশি। মানে একটার পর একটা প্ল্যান। একটা প্ল্যান সফল না হলে আরো পাচটা প্ল্যান রেডি আমাদের। আলহামদুলিল্লাহ।

সবাই রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রাখি,যাতে ভোরে ঘুমের ঘোরে কেউ কিছু ভূলে রেখে না যাই। রাত ২ টায় সবাই ঘুমিয়ে ভোর ৪ টায় ঘুম থেকে উঠে পিমবা দাদাকে কল দিয়ে জানিয়ে দেই, “দাদা, আমরা ঘুম থেকে উঠে গেসি, আপনি কি এখনো ঘুমাচ্ছেন? দাদা হেসে বলে, ৫টায় আসছি। ভোর পৌনে পাচটায় গাড়ি এসে পরে। আমরা গাড়ির ছাদে আমাদের ব্যাগ,বস্তা উঠাচ্ছি। আশিকুরের ছোট ভাই আকিব ও তার বন্ধু রেদোয়ান নিজেদের ব্যাগ গাড়ির ছাদে তুলে দিয়ে অন্যদের ব্যাগ তুলতে সাহায্য করছে, ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করছে। এই ট্রিপে আমরা ৯ জন ছিলাম। কারো কোনো অভিযোগ নেই, দ্বিমত নেই, ভেজাল নেই। সব প্রস্তাবেই সবাই পজিটিভ। ভোর রাতের গ্যাংটক। সবাই ঘুম। এই পাচটা দিন ভোর ৫টায় সবাই এক শহর থেকে অন্য শহর, এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তা, এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে ঘুরে বেড়ালাম। অনেক ক্লান্ত সবাই। আমাদের সিকিম ট্রিপ শেষ। হোটেলের বয় আমাকে জড়িয়ে ধরে হিন্দিতে বললো, ” দাদা, আবার আসবেন আর সাবধানে যাবেন”।

গাড়িতে উঠে রওনা করি দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। জ্বি, পাচদিনের সিকিম সফর শেষ। জীবনের সেরা ট্রিপগুলোর মধ্যে সিকিম ট্রিপটাও জায়গা করে নিলো। সারা জীবন মনে রাখার মত একটা ট্রিপ। আমাদের গ্রুপের সবাই একে অন্যকে সাহায্য করেছে। সবার মতের মিলের জন্যই সিকিম ট্রিপটা এতো সুন্দর হয়েছে। এই দলটাকে নিয়ে গর্ব করলেও কোনো অপরাধ হবে না। দোয়া করি আপনারাও এমন হেল্পফুল গ্রুপ নিয়ে ঘুরতে পারেন।
সিকিম ভ্রমন শেষ কিন্তু আমাদের ভ্রমন কিন্তু শেষ না। আমরা সান্দাকফু যাচ্ছি। ওইটা আরেক বড় কাহিনী। সান্দাকফুর অভিজ্ঞতাটা অন্য দিন দেওয়ার চেস্টা করবো, সকল হিসাব-নিকাশসহ।
যেহেতু লেখালেখি তেমন একটা পারি না, তাই কোথাও কোনো ভূল হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন।

করনীয়ঃ
১. বাসের টিকেটঃ
ঢাকার গাবতলী অথবা কল্যানপুর থেকে ভালো বাস পাবেন বুড়িমারী অথবা ফুলবাড়িয়া পোর্ট (বাংলাবান্ধা,পঞ্চগড়) যাওয়ার জন্য। বুড়িমারীর নন এসি বাসের টিকেট ৬৫০ টাকা আর শ্যামলী এস আরের এসি বাসের টিকেট ১৫০০ টাকা, যেটা ঢাকা-শিলিগুড়ি যায়। টিকেট চাইলে কমলাপুর থেকেও করতে পারবেন। বর্ডারে এস. আর. ট্রাভেলসের প্রভাব অনেক।
২. ট্রাভেল ট্যাক্সঃ
ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকে দিয়ে দিলে বর্ডারে কিছুটা এগিয়ে থাকবেন। ট্রাভেল ট্যাক্স ৫০০ টাকা আর দেওয়া লাগবে ঢাকার সোনালী ব্যাংকের নিউ মার্কেট অথবা মতিঝিল শাখায়।
৩. ভিসা এবং পোর্টঃ
প্রথমেই নেওয়া লাগবে ইন্ডিয়ান ভিসা, আর পোর্ট যদি হয় ফুলবাড়িয়া, মানে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা বর্ডার তাহলে তাহলে কিছু সুবিধা আছে। এই বর্ডারে তেমন ভিড় থাকে না আর এখান থেকে শিলিগুড়ি যেতে ৩০/৪০ মিনিট সময় লাগবে।
৪. মানি এক্সচেঞ্জঃ
২১ ফেব্রুয়ারি, চেংড়াবান্ধা বর্ডারে ১০০ টাকা= ৮৫ রুপি দিয়েছে আর ১০০ ডলারে পেয়েছি ৭১০০ টাকা।
৫. গ্যাংটক যাওয়ার গাড়িঃ
এখন আপনি শিলিগুড়িতে। গ্যাংটক যাওয়ার জন্য কোন গাড়ি ঠিক করবেন? যেসব গাড়ির নাম্বার প্লেটে “WB” লিখা, ওই গাড়ি গুলা ওয়েস্ট বেংগলের। ওইসব গাড়ি দিয়ে গেলে ভাড়া বেশি পড়বে। মানে ৩০০০-৩৫০০। আর যেসব গাড়ির সামনের বনেট “হলুদ রঙ” এর এবং নাম্বার প্লেটে “SK” লিখা, ওইসব গাড়ি সিকিমের। এইসব গাড়ি যদি ঠিক করতে পারেন তাহলে ভাড়া ২০০০-২৫০০ এই রেঞ্জের মধ্যে পড়বে। কিন্তু দামাদামি করা লাগবে। শিলিগুড়ি জংশন গিয়ে একটু খুজলেই পাবেন। আর দলবদ্ধ ভাবে গাড়ি ঠিক করতে যাবেন না। গ্রুপ থেকে যারা ভালোভাবে দামাদামি করতে পারে এমন ২ জন গেলেই কাজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
গাড়ি ঠিক করার সময় ড্রাইভারকে বলে দিবেন যে আপনারা রাংপো চেকপোস্টে দাড়াবেন পারমিশন এর জন্য। না হলে ওয়েটিং চার্জ হিসেবে আনুমানিক ৩০০ রুপি দেওয়া লাগবে।
৬. শিলিগুড়িতে দালাল হতে সাবধানঃ
আপনি শিলিগুড়ি যে জায়গায় গাড়ি থেকে নামবেন, ওইখানে অনেক দালালের আনাগোনা থাকে। ওরা যদি বুঝতে পারে যে আপনারা গ্যাংটক যাচ্ছেন তাহলে আপনাকে অনেক অফার দিবে। যে কোনো অফার দেক না কেনো, তাদের কোনো কথাই শুনবেন না। ওরা এমনও বলে থাকে যে, শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি না নিয়ে গেলে সিকিম যাওয়ার পারমিশন দেয় না। সবই মিথ্যা কথা।
৭. সিকিমের পারমিশনঃ
সিকিম যাওয়ার জন্য বাংলাদেশিদের পারমিশন নেওয়া লাগে। আপনারা চাইলে যমুনা ফিউচার পার্কে ইন্ডিয়ান হাই কমিশন থেকে একটা নির্দিষ্ট ফর্ম ফিলাম করে জমা দিলে পারমিশন পাবেন। এটার জন্য আপনাকে মোটামুটি এক সপ্তাহ অপেক্ষা করা লাগবে, লাইনে দাঁড়ানো লাগবে, ৩০০ টাকার মত ফি দেওয়া লাগবে। আবার যাতায়াত খরচ তো আছেই। কিন্তু কোনো ভেজাল ছাড়া সিকিম বর্ডারের রাংপো চেকপোস্ট থেকে ১০ মিনিটেই পারমিশন নিতে পারেন। এক পয়সাও লাগবে না। লাগবে সকল গ্রুপ মেম্বারদের পাসপোর্ট এবং ইন্ডিয়ান ভিসার একটা করে ফটোকপি এবং এটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
৮. প্রয়োজনীয় কাগজপত্রঃ
যেহেতু কয়েক জায়গায় আপনার পাসপোর্ট, ভিসার ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে, তাই দেশ থেকেই এইসবের ১০ কপি করে সাথে নিয়ে যাবেন।
৯. হোটেলঃ
গ্যাংটক পৌছানোর পর এখন আপনাকে হোটেল ঠিক করা লাগবে। এম.জি. মার্গের সামনেই অনেক ভালো মানের হোটেল আছে। আবার “ডেনজং সিনেমা রোড” এর সামনেও অনেক ভালো মানের হোটেল আছে। আপনারা যদি বুকিং ডট কমের মত অনলাইন কোনো ওয়েবসাইট দিয়ে হোটেল বুক করে যান তাহলে দেখা যাবে যে দাম বেশি পড়বে। আপনারা গিয়ে সরাসরি দামাদামি করে হোটেল নিলে দাম কম পড়বে।
১০. ট্রাভেল এজেন্টঃ
গ্যাংটকে হোটেল ঠিক করেই গ্রুপের ২ জন চলে যান ট্রাভেল এজেন্ট ঠিক করার জন্য। এম. জি. মার্গ, লাল বাজার অথবা আপনার হোটেলের আশে পাশেই অনেক ট্রাভেল এজেন্ট পাবেন। ট্রাভেল এজেন্ট থেকে প্যাকেজ নেওয়ার সময় কয়েকটা বিষয় ক্লিয়ার করে নিবেন,যেমন- খাবার সম্পর্কিত প্রশ্ন, কি গাড়ি দিবে, কোথায় কোথায় যাবে, কোন পর্যন্ত যেতে পারবেন, প্যাকেজ থেকে কোন হোটেল দিবে, হোটেলে রুমের ছবি দেখে নিবেন, ৩ বেলায় কি কি খাবার দিবে, হোটেলে গিজার আছে কিনা ইত্যাদি। মানে যাবতীয় সব ক্লিয়ার করে নিবেন। কোনো বিষয়ে সন্দেহ রাখবেন না। অনেক সময় ট্রাভেল এজেন্টরা এই বিষয়গুলো ক্লিয়ার করে না। যার ফলে আপনারা পরে সমস্যায় পরে যাবেন।
সাত জনের নর্থ সিকিমের ২ রাত ৩ দিনের মানে লাচেন এবং লাচুন এই দুই জায়গার প্যাকেজ মুল্য পরবে আনুমানিক ১৮-২০ হাজার রুপি। শুধু লাচুং যেতে হলে প্যাকেজ মুল্য পরবে আনুমানি ১০ থেকে ১২ হাজার রুপির মত। কিন্তু দামাদামি করা লাগবে।
১১. কাপড়ঃ
যেহেতু ঠান্ডা থাকবে তাই ভালো গরম কাপড় নিয়ে নিবেন। ভালো এবং মোটা জ্যাকেট, হাতমোজা, কানটুপি, ইনার ইত্যাদি নিয়ে নিবেন। ঢাকার বংগ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় খুজলেই পেয়ে যাবেন। বরফে হাটার উপযুক্ত জুতা নিয়ে নিবেন।
১২. খাবারঃ
গ্যাংটকে হালাল খাবারের জন্য চোখ বন্ধ করে যেতে পারেন লাল বাজারের আসলাম হোটেলে। এখানে “ফালে” নামক খাবারটা মিস করবেন না। এছাড়া এই হোটেলের সন খাবারই অনেক মজার।
নর্থ সিকিমে আপনি আপনার মন মত খাবার পাবেন না। তাই গাড়িতে এবং হোটেলে খাবার জন্য চিপস, বিস্কুট, কেক ইত্যাদি হাল্কা খাবার নিয়ে নিতে পারেন।
১৩. গ্যাংটক সিটি ট্রিপঃ
গ্যাংটকে সিটি ট্রিপের জন্য ৪ জনের গাড়ি ভাড়া পরবে ৯০০-১১০০ রুপির মত, যা আপনাকে প্রায় ৯/১০ টা জায়গা ঘুরে দেখাবে। এটা “হাফ ডে” প্যাকেজ। ফুল ডে প্যাকেজ আরেকটু বেশি পরবে। সিটির কোথায় কোথায় যাবেন তা গুগল থেকে আগেই দেখে সিলেক্ট করে নিবেন।
১৪. সিমঃ
সিকিমের জন্য “Vodafone” সবচাইতে ভালো। নেটওয়ার্ক ভালো থাকে। কিন্তু গ্যাংটক থেকে সিম কেনা কস্টকর। তো শিলিগুড়ি থেকেই সিম কেনা ভালো। সিম কেনার জন্য পাসপোর্ট আর ভিসার ফটোকপি লাগবে। সিম কিনে ১৯৯ রুপির একটা প্যাকেজ নিয়ে নিবেন, যা দিয়ে ২৮ দিন আপনি ইন্ডিয়ার যে কোনো নাম্বারে আনলিমিটেড কল করতে পারবেন আবার প্রতিদিন ১.৫ জিবি ইন্টারনেট ডাটাও পাবেন। আমরা ৭ জন মোট ৩ টা সিম কিনেছিলাম। ৩ টা সিম থেকে হটস্পোট শেয়ার করে বাকিরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেছি। যে দোকান থেকে সিম কিনবেন ওই দোকানে বলে দিবেন যে বাংলাদেশে কল করার জন্য একটা প্যাক এক্টিভেট করে দিতে। এই প্যাক দিয়ে আপনি বাংলাদেশে কল করতে পারবেন, প্রতি মিনিট কলরেট ২-২.৫ রুপি।

সতর্কতাঃ
*** দয়াকরে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। চিপসের প্যাকেট, বিস্কুটের প্যাকেট ইত্যাদি নির্দিস্ট জায়গায় ফেলবেন। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকবেন।
*** নর্থ সিকিমে আপনি পানির বোতল নিয়ে যেতে পারবেন না। তো সেখানে যাওয়ার আগে যদি আপনাদের কাছে প্লাস্টিকের কোনো বোতল থাকে তাহলে তা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে যাবেন।
*** গ্যাংটক সিটিতে প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানা করা হয়। তো প্রকাশ্যে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন।
*** সিকিম ভ্রমনের পর এবং অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝলাম, সিকিমের মানুষরা যেমন ভালো আবার তেমন আক্রমনাত্মক। তাই কথাবার্তা একটু বুঝে শুনে। অযথা তর্কে জড়াবেন না।
*** সিকিমের মানুষ বাংলাদেশীদের সন্মানের চোখে দেখে। একদিন আমরা এক দোকান থেকে চিপস, কেক কিনছি, এক পর্যায়ে দোকানের মালিক জিজ্ঞেস করলো আমরা কোথা থেকে এসেছি? যখন বললাম আমরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি, একথা শুনে উনি অনেক খুশি হয়ে বললো, “বাংলাদেশীরা অনেক সৌখিন, কয়েক মাস হয়েছে বাংলাদেশীদের সিকিম ভ্রমনের পারমিশন মিলেছে, আর এতো অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক বাংলাদেশী সিকিম আসতে শুরু করেছে, আমার সাথেও কয়েকজনের কথা হয়েছে, তোমাদের ব্যবহার অনেক ভালো”

তো বুঝতেই পারছেন বাংলাদেশীদের তারা অনেক সন্মান করেন। তো আমারা যারা সিকিম ঘুরে যাবো আমাদের সবার সিকিম ঘুরার সাথে একটা ছোট দ্বায়িত্ব থাকবে যে, আমাদের প্রতি তাদের এই সন্মানটা রক্ষা করার। আমারা এমন কিছু করবো না যাতে আমাদের দেশেএ সন্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লেখাঃ Rezwan Siddique Rifat

Tourplacebd.com