মাত্র ৫১ হাজার টাকায় ৬৪ জেলার ধুলো মাড়িয়ে বেড়ানো!

শিরোনাম দেখেই খটকা লাগতে পারে, প্রশ্ন জাগতে পারে- এও সম্ভব? খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন, ঢাকাকে কেন্দ্র ধরে দেশের সব জেলায় সড়ক পথে গেলে যাওয়া-আসার ভাড়াও লাগার কথা এরচেয়ে বেশী! তবে উচ্ছ্বাসটা যখন তারুণ্যের, বয়য়টা যখন একুশ, মাতৃভূমির প্রতিটি জেলায় পা ফেলা যখন একমাত্র ব্রত- তখন সব সম্ভব।

যে পাগলাটে কিংবা ক্ষ্যাপাটে তরুণের কথা বলা হচ্ছে, তার নাম রায়হান। ফেসবুকে তার একটি অ্যালবাম এখন রীতিমতো ভাইরাল। ৬৪ জেলার দর্শনীয় ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর ছবি জায়গা পেয়েছে সেই অ্যালবামে। ইতিমধ্যেই প্রায় আট হাজার মানুষ সেটিতে রিয়েক্ট করেছেন, শেয়ারও করেছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।

‘Mission : Toùr dé Bangldesh’- এর শুরু গল্পটা সম্পর্কে কথা হলো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রায়হান জানালো, ‘পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর ২০১৮ সালের জানুয়ারির দিকে মনে হলো নিজ জন্মভূমিটা ঘুরে দেখা উচিত, যেই চিন্তা মাথায় আসলো সেই বেড়িয়ে পরলাম। ঘুরতে ঘুরতে প্রায় দেড় বছর লেগে গেলো, ২০১৯ সালের ১০ জুলাই ৬৪ জেলা ভ্রমণ সম্পন্ন করলাম।’

আমাদের অধিকাংশের ধারণা ঘুর‍তে প্রচুর টাকা লাগে, কিন্তু দেড় বছরেই ৬৪ জেলা ঘুরে আসা রায়হান জানালো ভিন্ন কথা। ভিন্ন অভিজ্ঞতা। রায়হানের সোজাসাপ্টা কথা- “ঘুরতে অনেক টাকা লাগে এটি একটা ভুল ধারণা, ভ্রমণের জন্যে চাই স্পৃহা, দৃঢ় মানসিকতা, কঠোর পরিশ্রম। একজন সত্যিকারের ট্রাভেলারের ঘুরতে কখনোই খুব বেশি টাকার দরকার হয় না, ভ্রমণে কম খরচে টিকে থাকার জন্যে সব পথ তারা বের করে নেয়। আমিও তাই করেছি। গড়ে হিসেব করলে সমতল এলাকায় জেলা প্রতি ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে, আর কিছুটা দুর্গম ও নদী এলাকায় ১০০০ টাকা করে খরচা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বেশিদিন ঘুরলে বেশি খরচ।”

ফেসবুকে যুক্ত থাকার সুবাদে রায়হানের দেশ ঘুরে বেড়ানোর কিছু আপডেট নিয়মিতই চোখে পড়ছে। উদ্ভট সব কান্ডকারখানা- হোটেলে থাকার খরচ বাঁচাতে রেল স্টেশনে শুয়ে পড়া, কিংবা বাসের ছাদে চেপে বসা। দেশের সব জেলায় মাত্র দেড় বছরেই ঘুরেবেড়ানোর জন্য এই তরুণ বেছে নিয়েছেন ক্যাম্পাসের একাডেমিক ছুটি গুলোকে। গ্রীষ্মের ছুটি, দুই ঈদের ছুটি, শীতকালীন ছুটি; এমনকি রমজান মাসও পুরোটা ঘুরেছেন তিনি।

রায়হানের ভাষায়- “দেশ ঘুরে বেড়ানোর সবচেয়ে ভাল দিক আমাদের এই স্বাধীন দেশটা সম্মন্ধে জানতে পারা। ৬৪ জেলার ভাষা ৬৪ রকম, সংস্কৃতি গুলোও ভিন্ন রকম। খাবারের স্বাদ প্রতি জেলায় আলাদা। প্রতি জেলার মানুষের সাথে মিশতে পারা অনেক বড় একটা অর্জন, তারচেয়েও ভাল দিক ৬৪ জেলায় আপনি নেটওয়ার্কিং করতে পারছেন ভ্রমণের কারণে। দেশের প্রতি জেলার রাস্তাঘাট চিনতে পারা যায়। এটি জীবন চলার পথে নিজেকে সব পরিবেশে অভিযোজিত করে নিতে ভীষণ সাহায্য করেছে আমাকে।”

দেশভ্রমণের রোমাঞ্চকর আলাপে প্রশ্ন রেখেছিলাম- অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জেলা কোনটাকে মনে হয়েছে? রায়হানের উত্তর- “আসলে এক এক জেলা এক একটি বিষয়ের জন্যে সুন্দর। পাহাড়ি, ঝর্ণা, সাগর এলাকা একরকম সুন্দর, আবার সমতল এলাকা আরেক রকমের সুন্দর। সব মিলিয়ে আসলে কোনটা রেখে কোনটাকে সুন্দর বলবো হিমশিম খেয়ে যাই। পাহাড়ি এলাকা হলে বলবো বান্দরবন আর সমতল এলাকা হলে যশোর।”

পড়াশোনার পাশাপাশি রায়হান ২০১৫ সাল থেকেই নিজেকে যুক্ত রেখেছেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে, নানামুখী ভলান্টিয়ারিং বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত আছেন। দেশের তারুণ্যের একটা বিশাল অংশ যখন ইতিহাস বিমুখ, মুক্তিযুদ্ধকে মনে করে ‘সে অনেক পুরানো কথা’, রায়হান তখন হাতে ‘৭১ এর গনহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই’- লিখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঘুরে। পরোপকারকে যখন মানুষ ‘পন্ডশ্রম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করায় মত্ত, রায়হান তখন ‘রক্ত দিন, জীবন বাঁচান’ লিখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ায় চাঁদপুরে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যখন বরফ গলছে এক মেরুতে, বাড়ছে বাসযোগ্য জমি হারানোর শংকা। জলবায়ুর এমন ভীতিকর পরিবর্তনের সচেতনতা তৈরী করতে রায়হানের পরবর্তী মিশন “Walk for Climate Change”। এই মিশনে বাংলাদেশের এক প্রান্ত তেঁতুলিয়া থেকে আরেক প্রান্ত টেকনাফ পায়ে হেটে যাবে এই তরুণ। শুরু করবে আগামী বছরের মার্চে। প্রায় ৪০ দিনে রায়হান হাটবে ১০০৪ কিলোমিটার!

আমি ভীষণ আশাবাদী মানুষ, বিশ্বাস করি এই দেশ মাথা তুলে দাঁড়াবেই। তাই খুব প্রত্যাশা করি এমন রায়হানদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ুক, তাদের চোখেই আমারা বাংলাদেশকে অন্যরকম করে দেখতে চাই। আর গাইতে চাই- এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সেজে আমার জন্মভূমি…

দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

73026431_499309080801214_5121852103681114112_n
74615407_604237516988756_3060769724364226560_n

Tourplacebd.com