বনজঙ্গল আর আগ্নেয়গিরির দেশ “কোস্টারিকা”

অলমোস্ট দূষণমুক্ত বনজঙ্গলে ভরপুর। রেইন ফরেস্ট, ক্লাউড ফরেস্ট আর আগ্নেয়গিরির দেশ। তার একপাশে ক্যারিবীয়ান সাগর, অন্যপাশে প্রশান্ত মহাসাগর। আসলেই Pura vida। বলছিলাম কোস্টারিকার কথা। তারই স্লোগান, ‘Pura Vida’।
আমি যেখানেই যাই, কি করে যেন সাগর আর পাহাড়ের কম্বিনেশন পেয়ে যাই। আসলে অবচেতন মনে নিজেই যে কখন সাগর আর পাহাড়কে বেছে নেই, আমি নিজেও জানিনা। আমি নিজেও কোন এক দ্বীপকন্যা বলেই হয়তো।

আমরা অবতরণ করি কোস্টারিকার ক্যাপিটাল সিটি স্যান হোসের বিমানবন্দরে। ল্যান্ডিং এর সময়টা আমি সবসময় দেখতে দেখতে ল্যান্ড করা পছন্দ করি। শূন্য থেকে ভাসতে ভাসতে হঠাৎ এক নতুন ভূমিকে স্পর্শ করা খুব রোমাঞ্চকর লাগে আমার। কিন্তু এবার ঠিক ল্যান্ডিং টাইমেই আমার খুব মাথা ঘুরছিলো। তাই দেখা হয়নি। এনিয়ে আক্ষেপ করতে করতে প্লেন থেকে নামলাম। ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইন। ধীরগতিতে কাজ চলছে। টিভিতে ট্যুরিজম সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে। তাই দেখতে থাকলাম মনোযোগ দিয়ে।

বনজঙ্গলে আর আগ্নেয়গিরির দেশে এই প্রথম। ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত, দুই সমুদ্রের দিক থেকে দুই টেকনোটিক প্লেট (ক্যারিবীয়ান টেকনোটিক প্লেট ও প্যাসিফিক টেকনোটিক প্লেট) একে অপরকে ধাক্কা দেয়ায় সেই ধাক্কার লাইন বরাবর তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটা আগ্নেয়গিরি। আর প্রশান্ত উপকূলে কোস্টারিকার সমুদ্রসীমাতেই আছে শ’এর উপর আগ্নেয়গিরি। সবকটি সাগরের তলদেশে। এতগুলোর মাঝে বর্তমানে মাত্র ৪-৫টা সক্রিয় বা সুপ্ত অবস্থায় আছে। এভাবে আগ্নেয়গিরির ক্রমাগত উদগীরণ ও লাভার শীতলীকরণের মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ভূভাগের ঠিক মাঝখানে প্রাকৃতিক সেতুর মতো তৈরি হয়েছে এই দেশ। দুই আমেরিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত বলে দুই আমেরিকা থেকেই জীবজন্তু দেদারসে এখানে অভিবাসন করেছে। তাই এখনকার জীবজগৎ অন্য যে কোন একক দেশ বা মহাদেশের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্য এখানেই বিদ্যমান। কি উদ্ভিদ, কি প্রাণী!

Image may contain: mountain, sky, cloud, plant, grass, outdoor and nature

ইমিগ্রেশনের কাজ নির্বিঘ্নে শেষ হলো। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এলাম। মনে মনে রেডি হয়েছিলাম, বের হয়েই গরমের প্রথম ধাক্কা টের পাওয়ার জন্য। কিন্ত আমাকে অবাক করে দিয়ে তেমন কিছুই হলোনা। ট্রপিক্যাল দেশ হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমি আরো অনেক গরম হবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বেশ আরামদায়ক তাপমাত্রা। আমাদের কার রেন্টাল রিপ্রেজেন্টেটিভকে খুঁজে পেলাম। এরপর শাটলে করে নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে আমাদের গাড়ি বুঝে নিলাম। এরপর রওনা হলাম কোস্টারিকায় আমাদের প্রথম গন্তব্যে। প্রায় ৩ ঘন্টার ড্রাইভিং দূরত্বে লা ফরচুনা নামের এক পার্বত্য শহরে। রেন্টাল এর লোক আমাদের বেশ ভয় লাগাতে চেষ্টা করেছিল বলে, স্যান হোসে থেকে বের হলেই নেটওয়ার্ক পাবোনা, ফোনের জিপিএস কাজ করবেনা। সে আসলে চাইছিলো তাদের জিপিএস ডিভাইস গছিয়ে দিয়ে আরো কিছু পয়সা খসাতে। আমরা আসার আগে ভলোভাবেই জেনে এসেছিলাম, এখানে ওয়েজ (গুগলের আরেকটা ম্যাপ সার্ভিস) খুব ভালো কাজ করে। তাই কর্ণপাত করলাম না তাদের কথায়। কিন্তু মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম। যাই হোক, ড্রাইভ শুরু হলো আমাদের।

শহর থেকে বের হতেই দেখি আমরা পাহাড়ে উঠছি। স্যান হোসে শহরটাই আসলে পাহাড়ের কোলে। আর আমাদের যাত্রাপথটাও কোস্টারিকার পাহাড়ি অঞ্চল ধরেই। স্যান হোসে থেকে বের হয়ে মনে হলো বাংলাদেশে চলে এসেছি। আমাদের মফস্বলের মতোই বাড়িঘরের ধরন। তফাৎ শুধু পরিচ্ছন্নতায়, দূষণমুক্ততায়। হঠাৎ ক্ষুধা পেটে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। সাধারণত কোথাও বেড়াতে গেলে আমরা পিজ্জা, ফিশ বার্গার, ক্যাসাদিয়া কিংবা সি ফুড এগুলো দিয়েই খাওয়া সারি। কিন্তু এবার আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম যেখানেই যাই, লোকাল খাবার ট্রাই করবো। এখানকার ট্রাডিশনাল লোকাল খাবারের দোকানগুলোকে বলে সোদা। কোন ফ্যান্সি রেস্টুরেন্ট না, অনেকটা আমাদের দেশের রোড সাইড ক্যাফেগুলোর মতো। ওয়েজ দেখে কাছাকাছি এক সোদায় নামলাম। এখানকার ট্র্যাডিশনাল ফুডকে বলে ক্যাসাদো। এটা অনেকটা সেট মেনু টাইপ। ওখানে ট্রেতে সাজানো থাকে বেশ কিছু আইটেম। আপনি নিজে দেখে দেখে বলবেন কোনটা কোনটা নিতে চান। অনেক সোদায় অবশ্য এভাবে রেডি করা থাকেনা। কিছু প্রি সেট মেনু থেকে অর্ডার করতে হয়। ক্যাসাদোর কমন আইটেম গুলো হলো ব্ল্যাক বিনস দিয়ে রাইস যেটাকে বলে গালা পিন্টো, প্লেনেটেন (কলাকে ভেজে তৈরি করা মিষ্টি একটা ডেজার্ট টাইপ আইটেম), সালাদ, সিদ্ধ সবজি/ম্যাশ পটেটো, একটা প্রোটিন, আর বিফ দিয়ে ডালের একটা আইটেম। সমস্যা হলো ভাষা। এরা স্প্যানিশ বলে এবং এদের বেশিরভাগই ইংরেজি একেবারেই জানেনা। এই নিয়ে পরপর তিন বছর স্প্যানিশ কথা চলে এমন জায়গায় আসা হলো। স্প্যানিশটা দেখছি আর না শিখলেই চলছে না। আমরা যেহেতু হালাল হারাম বাছি, তাই কোন প্রকার মিট যেন আমাদের প্লেটে না আসে, সেজন্য কমিউনিকেট করাটা খুব জরুরি। অনেক কষ্টে ইশারায়, আকারে ইঙ্গিতে বোঝালাম আমরা কি চাই। আমার জামাই কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো ভাঙ্গাচুরা স্প্যানিশ জানে। সেই সাথে গুগল ট্রান্সলেটর তো আছেই। ক্যাসাদোর সাথে প্যাসকাদো (মাছ) নিলাম। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা ছিল বলে কিনা জানিনা, খুবই সুস্বাদু আর উপাদেয় লাগলো খাবার। ঘোষণা দিয়ে ফেললাম, আগামী কয়েকদিন ক্যাসাদোর উপরেই থাকবো আমি।

Image may contain: sky, tree, cloud, plant, outdoor, nature and water

পেট শান্ত করার পর আবার পাহাড়ি পথ বেয়ে চলতে থাকলাম।যেদিকেই তাকাই শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝেমাঝে বাড়িঘরও আছে। বেশির ভাগ বাড়ির সামনে অনেক ফুলগাছ। একতলা বাড়ি সব, কোনটা টিনশেড, কোনটা পাকা। উঠোনে ফুটে আছে নানা রকম ফুল। বাগানবিলাস, জবা, অলকানন্দা, অর্কিড তো অহরহ। আরো কত নাম না জানা ফুল! আমি আসলে তেমন ফুল চিনিই না। চেষ্টায় আছি চেনার।
পাহাড়ের সৌন্দর্য নিয়ে আর কি বলবো! আমার কাছে মনে হয়েছে যেন বান্দরবান, খাগড়াছড়ি চলে এসেছি। এতো সুন্দর তার রূপ! দূর পাহাড়ের মাথায় মেঘগুলো ভাসছে। কি অসাধারণ লাগছিলো! আমি বৃথাই ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে থেমে থেমে অবশ্য কিছু ছবি তুলেছি। এভাবে একসময় চলে আসলাম আমাদের গন্তব্য ছোট্ট পার্বত্য শহর এরিনাল আগ্নেয়গিরি সংলগ্ন লা ফরচুনায়। শহর না বলে গ্রাম বলাই বোধ হয় ভালো হবে। এরিনাল আগ্নেয়গিরি ও লেক এরিনালকে কেন্দ্র করে লা ফরচুনা, এরিনাল এই ছোট্ট শহরগুলো গড়ে উঠেছে।

সময় নিয়ে দেখতে দেখতে যাওয়ায় আমাদের ৩ ঘন্টার যাত্রা শেষ হয়েছে ৪.৫ ঘন্টায়। যখন আমাদের রিসোর্টে পৌঁছাই, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এখানকার স্থানীয় সময় অনুযায়ী অনেক তাড়াতাড়িই সূর্য ডোবে। অবশ্য সেজন্য উদয়ও হয় তাড়াতাড়ি। সন্ধ্যা নামার পর আসলে তেমন কিছু করার থাকেনা। এখানে কোন ভাইব্রেন্ট নাইট লাইফ নেই। রিসোর্টের ডেস্কের মেয়েটাও ইংরেজি জানেনা। তার সাথেও আকারে ইঙ্গিতে কথা সেরে রুমের চাবি বুঝে নিলাম। আগ্নেয়গিরিটা কোথাও উঁকি দিচ্ছে নাকি খেয়াল করার চেষ্টা করতেই মেয়েটা বুঝে গেল। ইঙ্গিতে জানালো সামনেই মেঘে ঢাকা যে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে, সেটাই এরিনাল ভলকানো যাকে দেখার জন্য এখানে আসা। কিন্তু প্রায় পুরোটাই মেঘে ঢাকা বলে বুঝার উপায় নাই। সেদিনের মতো দিনের সমাপ্তি করে আমাদের কটেজে চলে গেলাম। কটেজে ঢোকার সময় ঝর্ণা বা নদীর প্রবাহের কলকল শব্দ শুনতে পেলাম। রাতে অবশ্য খাওয়ার জন্য একবার বের হয়েছিলাম। এরপর ঘুমিয়ে পড়লাম বেঘোরে। আজকের দিনটায় অনেক জার্নি হয়েছে। সেই আটলান্টা থেকে দুইটা ফ্লাইট ধরে স্যান হোসে, এরপর ড্রাইভ করে লা ফরচুনা।

Image may contain: sky, tree, plant, cloud, outdoor and nature

পরদিন ঘুম ভাঙলো ভোর ৫টায়। এখানে সূর্যোদয় হয় ৫.৩০ মিনিটে। আমি উঠে গেলাম। বারান্দায় গিয়ে ভোর হতে দেখলাম। শান্ত ভোরের স্নিগ্ধ রূপ। শিশির ভেজা সবুজ লনে হেঁটে বেড়ালাম কিছুক্ষণ। কলকল শব্দের উৎস আবিষ্কার করলাম। পাশেই বয়ে গেছে ছোট্ট একটা নদী। গাছ থেকে বেশ কিছু কমলালেবু আকারের লেবু পড়ে থাকতে দেখলাম ঘাসের উপর। লেবু গাছ যে এত বড় হতে পারে! বৃক্ষ বলাই ভালো। ছোট্ট সবুজ লনকে ঘিরে কিছু একতলা, কিছু দোতলা কটেজ। ট্রপিক্যাল অঞ্চলের বিভিন্ন রকম ফুল আর গাছগাছালি। সেইসাথে পাখিদের ঘুম ভাঙ্গানিয়া কিচিরমিচির কলতানে মুখরিত চারদিক। অনেক নান্দনিক পরিবেশ। প্রাতঃভ্রমণ সেরে রুমে ফিরে এলাম। পাভেলো, মানে আমার হাসবেন্ডকে জাগিয়ে দিলাম। এরপর তৈরি হয়ে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম।

আজকে আমরা জিপিং করতে যাব। এটা মূলতঃ দড়ির উপর ঝুলতে ঝুলতে কয়েক মাইল ভ্রমন। আমার জন্য অবশ্যই অনেক সাহসের ব্যাপার। কিন্তু এখানকার রেইন ফরেস্ট দেখার জন্য কয়েকটা উপায়ের মাঝে জিপিং রিকমেন্ডেড। রেইন ফরেস্টের আসল সৌন্দর্য কিন্তু এর উপরে। ভিতরে তো অন্ধকারের কারণে তেমন কিছু দেখা যায়না। গাছগুলোর উঁচু ডালপালা আর পাতা, ছাতা বা শামিয়ানার মতো গাঢ় ছায়া দিয়ে রাখে বনের ভূমিকে। এই শামিয়ানা বা ক্যানোপিই হল রেইন ফরেস্টের আসল সৌন্দর্য যেটা দেখতে হবে একটু উপর থেকে। And it was a great decision! নইলে রেইন ফরেস্টের আসল সৌন্দর্যই অদেখা থেকে যেতো। তবে ভবিষ্যতে আর সাহস হবেনা আমার এই জিনিস করার।

আমাদের সাথে আরেক যুগল এসেছেন জিপিং করতে। তারাও যুক্তরাস্ট্র থেকে এসেছেন। আমাদেরকে জিপিং এর জন্য প্রয়োজনীয় গিয়ার পড়িয়ে গাড়িতে করে জায়গামত নিয়ে যাওয়া হলো। ইন্সট্রাক্টর আমাদের প্রাথমিক নির্দেশমালা দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন কি করতে হবে, না করতে হবে। দুজন ইন্সট্রাক্টর ছিলেন। একজনের নাম অ্যান্টোনিও, অন্যজনের নাম মাইক। মাইক প্রথমে চলে গেলেন আমাদের হাতে কলমে দেখিয়ে দিতে। অ্যান্টোনিও সবার শেষে যাবেন। ঐ যুগল শুভ সূচনা করলেন আমাদের জিপিং এর। এরপর এলো আমার পালা। আমি প্রস্তুত হয়ে শেষ মুহূর্তে খুব নার্ভাস হয়ে পড়ি। তাই সরে গিয়ে পাভেলোকে সু্যোগ করে দেই। ও আমার উপর খুব রাগ করে চলে গেল দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে। আমি অবশ্য ওর ভিডিও ধারণ করছিলাম। এরপর অনেক সাহস জড়ো করে আমিও ঝুলে পড়লাম আল্লাহর নাম নিয়ে।

মোট ১৩টা লাইন অতিক্রম করতে হয়েছিল আমাদের। প্রথম ৩-৪ টা পর্যন্ত আমি অনেক ভয় পেয়েছি। এরপর উপভোগ করতে শুরু করি। অপর যুগলের সাথেও কিছুটা আলাপ পরিচয় হলো। তারা প্রায় ১৮ বছর ধরে একসাথে আছেন, কিন্তু বিবাহিত নন। মহিলাটার প্রায় আমার বয়সী একটা মেয়ে আছে যে নাকি তাকে নিত্য নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। পেশায় তিনি একজন মেডিকেল এসিস্টেন্ট। ইন্সট্রাক্টরদের একজন অ্যান্টোনিয়, বেশ কথা বলে। সেও জানালো কথায় কথায়, সেও অবিবাহিত, তিন ছেলেমেয়ে আছে প্রাক্তন সঙ্গীর সাথে। কিন্তু সে তার সাথে প্রতারণা করে তার বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়ে চলে গিয়েছে। কোস্টারিকার আইন নাকি বেশ নারীবান্ধব। যার সুযোগে তার প্রাক্তন সঙ্গী এহেন কাজ করতে পেরেছে। সত্যমিথ্যা জানিনা। তবু আফসোস প্রকাশ করলাম ভদ্রতার খাতিরে।

Image may contain: plant, sky, mountain, cloud, grass, tree, outdoor and nature

এভাবে গল্পে গল্পে হেসেখেলে, কখনোবা ভয়ে কাঁচুমাঁচু হয়ে ঝুলতে ঝুলতে একটার পর একটা লাইন পার হচ্ছিলাম। কি যে অদ্ভুত সুন্দর সুন্দর দৃশ্য উপর থেকে দেখতে পাওয়া যায়! ঘন রেইনফরেস্ট। এই বিশাল উঁচু উঁচু সব গাছপালা। কিন্তু আমরা ছিলাম সেই বনের প্রায় মাথায়। যেদিকেই তাকাই, চোখ ধাঁধাঁনো সবুজের বন্যা। জিপিং প্লাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে সেসব দৃশ্য দেখতে দেখতে নেক্সট লাইনে ঝুলার জন্য রেডি হই। কোনো কোনো লাইনে ঘন্টায় ৮০কিমি বেগেও ছুটেছি। সবমিলিয়ে ভয়, অ্যাডভ্যাঞ্চার আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি! এর মাঝে পাভেলো আরেকটা দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলল। বাঞ্জি জাম্পের মতই অনেকটা টারজান সুইং করলো। টারজান সুইংটা হলো, প্রায় ১০০ ফুট একটা দড়ির সাথে নিজেকে বেঁধে শূন্যে লাফ দেয়া। আমি এসবে আতঙ্ক ছাড়া আনন্দের কিছু পাইনা।

শেষ ২টা লাইন অতিক্রম করার সময় দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। অনিন্দ সুন্দর এক রিসোর্ট। উপর থেকে এরিয়াল ভিউ দেখতে পাচ্ছিলাম আমরা। তাই বুঝতে পারছিলাম কতখানি বিশাল আর সুন্দর এই রিসোর্ট। সেই মুগ্ধতা নিয়েই শেষ হলো জিপিং অভিযান। আমি যেন প্রাণে পানি ফিরে পেলাম।

এই রিসোর্টেই আনন্দ উপভোগের এতো আয়োজন, আর এতোই সুন্দর, অনায়াসে এক দুইটা দিন এখানেই কাটিয়ে দেয়া যায়। এতো সুন্দর একটা রিসোর্ট। কিন্তু আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সক্রিয় ঝুঁকি অঞ্চলে অবস্থিত। আগ্নেয়গিরিটা জেগে উঠলেই এই সুন্দর রিসোর্ট স্মৃতিতে পরিণত হতে পারে।

পুলে নামব ঠিক করলাম। এখানকার রিসোর্টগুলোর অন্যতম আকর্ষণ হলো হট স্প্রিং পুল। পানির উষ্ণতা ৪০ সেলসিয়াস। সক্রিয় জিওথার্মাল এক্টিভিটির কারণে এই অঞ্চলে বেশ কিছু ন্যাচারাল হট স্প্রিং আছে। রিসোর্টগুলোর দাবি, তারা সেখান থেকে পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে এই হট স্প্রিং পুলে। তাপমাত্রা একটু কমিয়ে সরবরাহ করতে হয় বৈকি। হট স্প্রিং পুলের পানি যদিও ইনিশিয়ালি খুব গরম অনুভূত হয়, কিন্তু পরে এটাই আরামদায়ক লাগে। আমার তো এরপর থেকে ঠান্ডা পানির পুল আর নামতেও ইচ্ছা হয়না।
পুলসাইড থেকে আগ্নেয়গিরির বেশ চমৎকার ভিউ পাওয়া গেলো। আগ্নেয়গিরি দেখতে দেখতে প্রিয় মানুষের সাথে হট স্প্রিং পুলে স্নান! অতঃপর জাকুজি। আহা! কি মধুর সেই অনুভূতি। চূড়াটা যদিওবা এখন পর্যন্ত মেঘেই ঢাকা। হঠাৎ মনে হলো, অগ্ন্যুৎপাত দেখতে দেখতে যদি এই পুলে স্নান করতে পারতাম, মন্দ হতোনা! বিপজ্জনক কিন্তু লাইফটাইম অভিজ্ঞতা! 😋

আরেকটা অভিজ্ঞতা না বললেই নয়। একমাত্র আমি ছাড়া আর কোন রমণী সেখানে আমার মতো এত বেশি কাপড় পরিধান করা ছিলনা। অবশ্য এমন অভিজ্ঞতা পশ্চিমের সব সৈকতেই হয়েছে। তবু এরকম রিসোর্টগুলোতে আরো অনেক বেশি। তাই পুলে নামার সময় আমার পুলের পোশাক দেখে অনেকেই অবাক হয়ে আড় চোখে দেখছিল। তবে অতটুকুই। প্রথম প্রথম অস্বস্তি অনুভব করলেও এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।
আমি সাঁতার জানিনা। আমার দৌঁড় পানিতে একটু দাপাদাপি করা পর্যন্তই। ও আবার সাঁতার জানে। তাই সাঁতরে নিল কিছুক্ষণ। পুলে দাপাদাপি শেষে ভেজা পোশাক পাল্টে নিয়ে রিসোর্টের ভিতরেই দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। এরপর রিসোর্ট প্রাঙ্গন আরেকটু ঘুরে ফিরে দেখলাম। এদেশের ট্রপিক্যাল ওয়েদারে যতরকম বাহারি শ্রাব আর ফুল গাছ হতে পারে তার সবকটিরই একটু একটু নমুনা মনে হয় এই রিসোর্টেই আছে।

Image may contain: plant, tree, bridge, outdoor and nature

রিসোর্ট প্রাঙ্গনে ঘুরতে ঘুরতেই দেখলাম আগ্নেয়গিরির চূড়া থেকে মেঘ সরতে শুরু করেছে। অনেকটাই উন্মুক্ত হয়েছে আজকে। তাই দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম, আরো পরিস্কার দর্শন পাওয়া যেতে পারে এমন স্থানের সন্ধানে। কাছেই লেক এরিনাল। সেদিকেই গাড়ি ছোটালো পাভেলো। কিছুদূর যেতেই আমাদের কাংক্ষিত স্থান পেয়ে গেলাম। বিশাল বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর আর বনজঙ্গলের মাঝে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০০ ফুট মাথা উঁচু করে আছে এরিনাল ভলকানো। আমরা যে কয়দিন ছিলাম, এর চেয়ে ভালো আর দেখা যায়নি। চূড়ার কাছে আগ্নেয়গিরির লাভা নির্গমনের পথ বেশ পরিস্কারভাবেই দেখা যাচ্ছিল।

এরিনাল ভলকানো। কোস্টারিকার সবচেয়ে তরুণ আগ্নেয়গিরি। মাত্র ৭০০০ বছর এর বয়স। আগ্নেয়গিরি হিসেবে তরুণই বটে। প্রায় নিঁখুত মোচাকৃতির এই আগ্নেয়গিরি তার আকৃতির জন্যই বেশি জনপ্রিয়। যদিও সর্বশেষ বিস্ফোরণের পর মোচার মত নিঁখুত আকৃতি পুরোপুরি থাকেনি আর। সর্বশেষ এটি সক্রিয় হয়েছে ১৯৬৮ সনে। প্রায় ৪৫০ বছর বিশ্রামের পর এটি পুনরায় জেগে ওঠে আচানক এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের মাধ্যমে। স্বল্পসময়ে ৩টা ছবির মত গ্রাম ও শ’খানেক মানুষ সেই বিস্ফোরণের বলিদান হয়। এরপর অগ্ন্যুপাতের ভয়াবহতা ধীরে ধীরে কমে আসলেও কমবেশি চলতে থাকে। টানা ৪২ বছর বিভিন্ন মাত্রায় সক্রিয় থাকার পর ২০১০ সালে আপাত সর্বশেষ উদগিরণ হয়। এরপর থেকে এই আগ্নেয়গিরি সুপ্তাবস্থায় আছে। তবে এই অঞ্চলের সক্রিয় জিওথার্মাল এক্টিভিটি বলে দেয়, এটি ভূমির কয়েক কিলোমিটার ভিতরে এখনো সক্রিয়। পরবর্তী বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

এরিনাল লেকের আশেপাশে আরেকটু ড্রাইভ করে সেদিনের মতো যাত্রা সমাপ্ত করে ফিরে এলাম। কটেজে ফেরার সময় একটা সোদায় নেমে ডিনার করে নিলাম। আমি বেশ উপভোগ করতে শুরু করেছি এখানকার লোকাল খাবার। খাবার দাবারের টুকটাক স্প্যানিশ নামও মুখস্ত করে ফেলেছি। কটেজে ফিরে পরদিনের পরিকল্পনা গুছিয়ে ঘুমোতে গেলাম।

পরদিন সকালে প্ল্যান মোতাবেক সকাল সকাল নাস্তা সেরে আমরা পৌঁছে গেলাম নির্ধারিত স্থানে। আজ আমরা ঘোড়ায় চড়ে না শুধু, রীতিমত অশ্বচালনা করে আগ্নেয়গিরির পাদদেশে আগ্নেয় হ্রদ দেখতে যাচ্ছি। সেখানে আমাদের অপর দু’জন সহযাত্রী অলরেডি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এবার দু’জন বান্ধবী। একজন আবার অশ্বচালনায় মোটামুটি পারদর্শীও। বাকি তিনজন আজকেই প্রথম অশ্বচালনা করবো। আমাদের ইন্সট্রাকর হেক্টর এসে প্রাথমিক নিয়মকানুন বলে দিলেন। এই উছিলায় অশ্বচালনার ছোট্ট একটা হাতেখড়ি হয়ে গেল। ঘোড়াকে কিভাবে লাগাম টেনে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, ডান বামে নিতে হয় হাতেকলমে জানলাম। এরপর আমরা নিজেদের ঘোড়ায় সওয়ার হলাম। আমার জনের নাম টিনা, ওর ঘোড়ার নাম ডল। সবকটাই মাদী ঘোড়া।

শুরু হল আমাদের যাত্রা। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই, কখনো পিচঢালা রাস্তা, কখনো পাহাড়ি এব্রোথেব্রো পথ, কখনো রেইন ফরেস্টের ভিতর দিয়ে, আবার কখনো বা ছোট্ট জলাধার পার হয়ে চলেছে আমাদের যাত্রা। সাথে বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে দেখা আগ্নেয়গিরি কিংবা এক পাহাড়ের উপর থেকে দূর পাহাড় অথবা সমতলের অদ্ভুত সুন্দর সব দৃশ্য তো ছিলই। এভাবে পৌঁছে গেলাম আগ্নেয়গিরির পাদদেশে অবস্থিত হ্রদের কাছে। এজন্য আমাদের সমতল থেকে বেশ খানিকটা উপরে উঠে আসতে হয়েছে। শান্ত স্বচ্ছ সবুজ হ্রদের পানি। হ্রদটা কিন্তু বেশি বড় না। হেক্টরের কাছে জানলাম, মাত্র কয়েক বছর আগে এর জন্ম হয়েছে। এটা এখনো বাড়ছে। হেক্টর ও অপর একজন সহযাত্রীর ঘোড়া তৃষ্ণার্ত ছিল। ঘোড়াদুটো হ্রদের পানি পান করে নিল। সবাই একটা করে লাভা রক নিলাম শখের বশে। এরপর আরেকটা পাহাড়ের উপর উঠে এলাম আগ্নেয়গিরি ও তার হ্রদ একসাথে দেখা যায় যেখান থেকে। ওখানে ছোট্ট যাত্রাবিরতি দেয়া হল আমাদের। ঘোড়া থেকে নেমে এলাম। উপভোগ করলাম চারপাশের অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য। ওখান থেকে দেখা আগ্নেয় হ্রদ সহ আগ্নেয়গিরির দৃশ্যটা ছিল সবচেয়ে সুন্দর। চূড়াটা যদিও মেঘে ঢাকা ছিল।

হেক্টরের কাছেই জানলাম, ২০১০ সালে সর্বশেষ উদগিরণের পরেও নাকি এরিনাল আগ্নেয়গিরির চূড়া থেকে মাঝেমাঝে ধোঁয়ার মত কুন্ডলী পাকিয়ে উঠেছে বা এখনো উঠে। তাই এদেশের সরকার সার্বক্ষণিক এর গতিবিধি কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখেছে। যেন হঠাৎ করে আরেকটি ট্র্যাজেডির জন্ম না হয়।

অথচ এই আগ্নেয়গিরিগুলোই এই দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণ। এই আগ্নেয়গিরির লাভাই এখানকার ভূমিকে করেছে অনেক উর্বর। আমরা সবাই জানি, আগ্নেয়গিরি সম্বলিত ভূমি খুব উর্বর হয়। পৃথিবী তার গর্ভে যতরকম পুষ্টিকর খনিজ পদার্থ আছে, সব উগরে দেয় অগ্নুৎপাতের মাধ্যমে। হয়তো বা ভূপৃষ্ঠকে উর্বর করার জন্যই! তাই অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ হওয়ার কিছু বছরের মধ্যেই আবার সবুজে শ্যামলে সুশোভিত হয়ে ওঠে চারপাশ। কত যে চমকপ্রদ আর বিচিত্র এখনকার উদ্ভিদজগৎ। ট্রপিক্যাল অঞ্চল এমনিতেই বৈচিত্র্যময় হয়ে থাকে। জায়ান্ট সাইজের নানারকম অর্কিড এখানকার বনবাদাড়ে এমনিতেই ফুটে থাকে। আর নানা বাহারের নানা রঙের গাছগাছালি তো আছেই। আমি বেশি ফুল বা গাছ চিনিও না। আর বনানী মানেই যে জীববৈচিত্র্য সেটা বলে দিতে হয়না।

হেক্টর যেতে আসতে আমাদের শ্লথ দেখিয়েছে দুইটা, কিছু শকুন আর টিয়া পাখি টাইপের পাখির ঝাঁক আর বাসাও দেখিয়েছে। ফেরার পথে আমার ঘোড়াটা মাঝেমাঝেই থেমে যাচ্ছিল। সবাই মজা করছিল, একথা বলে, টিনা নাকি থেমে থেমে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছে। তাই হেক্টর সাহেবকে প্রায়ই নেমে আসতে হচ্ছিলো একটু শাসন করতে। এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা আর একরাশ স্মৃতি নিয়ে শেষ হল আমাদের অশ্বযাত্রা। একথা বলবো না আমি, যে একদমই ভয় পাইনি। প্রথম দিকে বেশ ভয় পেয়েছি। তবে ধীরে ধীরে সে ভয় কেটে গিয়েছে। তখন বরং বেশ উপভোগই করেছি।
আজকেও কিছুক্ষণ হট স্প্রিং পুলে দাপাদাপি করলাম। এরপর স্নান ও লান্ছ সেরে এখানকার অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত ব্রিজ দেখতে চললাম।

আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেটা একটা প্রাইভেট রেইন ফরেস্ট রিজার্ভ। মিস্টিকো এরিনাল হ্যাঙ্গিং ব্রিজ পার্ক। বেশ কয়েকটা ঝুলন্ত ব্রিজ আছে এখানে। কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী আরো আছে প্রায় ৭০০ প্রজাতির প্রাণী, ৩০০ প্রজাতির পাখি ও ৭০০ প্রজাতির উদ্ভিদ।

রেইন ফরেস্ট আর ক্লাউড ফরেস্ট এই অঞ্চলের আরেক বৈচিত্র্য। পুরো দেশটাই হোম টু ফরেস্ট। ক্লাউড ফরেস্ট আমি যা বুঝেছি অনেকটা রেইন ফরেস্টের মতোই। কিন্তু এটা অধিক উচ্চতায়, সাধরণত পাহাড়ের গায়ে বা উপরে অবস্থিত। নামেই বোঝা যাচ্ছে, ওখানে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় সবসময়ই মেঘ থাকে। বনের মাথায় সারাবছর সবসময়ই মেঘ। তাই রেইন ফরেস্টের চেয়েও বেশি অন্ধকার এই বন। আর রেইন ফরেস্ট মানেই বিশাল লম্বা লম্বা গাছ আর প্রচুর বৃষ্টিপাত। কমপক্ষে ১০০-১৫০ ফুট উঁচু উঁচু সব গাছ। কিছু কিছু গাছের উচ্চতা এর চেয়েও বেশি (সর্বোচ্চ ২০০ ফুট)। সারাবছরই আবহাওয়া এখানে কমবেশি একই রকম। প্রতিদিনই বৃষ্টি নামে ঝুপ করে। আবার দেখতে দেখতে শেষও হয়ে যায়। দিনে ১০-১৫ বার বৃষ্টি খুব স্বাভাবিক ঘটনা এখানে। আগেই বলেছি, রেইন ফরেস্টের আসল সৌন্দর্য এর উপরে। গাছগুলোর উঁচু ডালপালা আর পাতা, ছাতা বা শামিয়ানার মতো গাঢ় ছায়া দিয়ে রাখে বনের ভূমিকে। এই শামিয়ানা বা ক্যানোপিই হল রেইন ফরেস্টের আসল সৌন্দর্য যেটা দেখতে হবে একটু উপর থেকে। যারা প্রাণবৈচিত্র্য ভালোবাসেন তাদের জন্য বনের ভিতরটা অবশ্যই আদর্শ জায়গা। কিন্তু যারা আমার মত, তারা রেইন ফরেস্টকে দেখতে হবে উপর থেকে। ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে এই ক্যানোপিই দেখতে এসেছি আমরা।
আমরা যখন এই পার্কে পৌঁছাই, তখন প্রচন্ড বাতাস বইছে। হিমশীতল দমকা বাতাসে দূর পাহাড় থেকে মেঘ ভেসে ভেসে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ এসে চারপাশ ঘিরে ফেলল। অতঃপর নামলো ঝুম বৃষ্টি। এখানে আসার পর থেকে প্রতিদিনই বৃষ্টি দেখছি। ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি আসে দিনে ৫-৬ বার। কিন্তু ১ মিনিটের বেশি দীর্ঘ হয়না। কিন্তু আজকের বৃষ্টিটা অন্যরকম। মেঘটাও ছিল নিকষ কালো। আজকে এমনিতেই বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। আমাদের একটা ছাতা আছে বটে। কিন্তু এই বৃষ্টি তাতে মানবেনা। অগত্যা পার্কের প্রবেশমুখে রেস্টুরেন্টে বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। তাতে লস হয়নি একটুও। রেস্টুরেন্টের খোলা জানালা দিয়ে পাহাড়ি বৃষ্টির অদ্ভুত সৌন্দর্য আবিষ্কার করলাম। বৃষ্টি কিছুটা ধরে এলে পার্কের ম্যাপ নিয়ে ঢুকে পড়লাম। ৩.২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটা ট্রেইল চলে গেছে রেইনফরেস্টের মধ্য দিয়ে। এই ট্রেইল ধরে এগুলেই পড়বে বেশ কয়েকটা ঝুলন্ত সেতু। সবচেয়ে লম্বা ব্রিজটি প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ। প্রথম যে ঝুলন্ত ব্রিজে উঠলাম সেটা এরিনাল ভলকানো ভিউ ব্রিজ। এই ব্রিজ থেকে এরিনাল ভলকানো দেখা যায়। ব্রিজের মাঝামাঝি যখন গেলাম, হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমরা আশেপাশের অধিকাংশ গাছের চেয়ে উপরে আছি। নিচে তাকালে প্রায় ১৫০-২০০ ফুট নিচে দেখা যাচ্ছে বনের ভূমি! কি রোমাঞ্চকর সেই অনুভূতি! সেই সাথে বৃষ্টিস্নাত বাতাস। আকাশে মেঘের গুড়গুড় ডাক। যখন তখন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার হুমকি। এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেলো শরীরে। প্রাণভরে রেইনফরেস্ট তথা এর ক্যানোপির সৌন্দর্য দেখে নিলাম।
পরের একটা ব্রিজে উঠে দেখি, প্রায় ১৫০ ফুট নিচে কলকল শব্দে বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি খরস্রোতা এক নদী। ঝর্ণাটাও দেখতে পেলাম ব্রিজে উঠার আগে এক ঝলক। আমরা যখন মুগ্ধ হয়ে আশপাশ দেখছি, আমাদের দেখতে হাজির হল আরো কিছু অতি উৎসাহী অতিথি। তিন চারটা বানর। কিছুক্ষণ তাদের খেলাধূলা দেখে বেশ মজা পেলাম। আর পাখির কিঁচিরমিঁচির তো আছেই। এখানে নাকি জাগুয়ারও দেখা যায়। কিন্তু তারা সন্ধ্যার পরে বের হয়। এক্সপার্ট গাইডসহ আসলে অনেক বেশি ওয়াইল্ড লাইফ দেখা যায়। আমরা সেটা করিনি। ইনফ্যাক্ট আমরা যখন পার্কে প্রবেশ করি, তখন আমরাই একমাত্র দর্শনার্থী ছিলাম। ঝড়বৃষ্টির জন্য সেদিন তেমন দর্শনার্থী ছিলোনা। যারা এসেছিলো, তারা আমরা পার্কে প্রবেশের আগেই চলে গিয়েছে। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। স্বাধীনভাবে নিজেদের মতো এক্সপ্লোর করেছি। যতক্ষণ খুশি ঝুলন্ত ব্রিজে দাঁড়িয়ে থেকে রেইন ফরেস্ট ক্যানোপি দেখেছি। আর আমাজন রেইন ফরেস্ট কবে দেখতে পাবো সে চিন্তা করেছি। 🤔 😛

রেইন ফরেস্ট অভিযান শেষ করে আবার ফিরে এলাম লা ফরচুনায়। ডিনারের জন্য গেলাম আরেকটা নতুন সোদায়। আমরা স্প্যানিশ ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলছি দেখে ইংরেজি জানে এমন একজন নিজেই এগিয়ে এল। ওর নাম ন্যান্সি। আমরা সব্জি খাই, মাংস খাইনা, তার মানে নিরামিশাষী, এটা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু আবার মাছ খাই, এটা কোন বিচিত্র খাদ্যাভাস সে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল। পরে তাকে আমি আসল ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। বাংলাদেশের কথা জানতে পেরে ন্যান্সি খুব খুশি হয়ে গেল। জানালো, তার হাসবেন্ড ভারতীয়। ব্যাঙ্গালোরে বাড়ি। সে ভারতে বেশ কয়েকমাস ছিল। ওখানে অনেক নিরামিশাষী দেখেছে সে। বাংলাদেশের নামও তখনই শুনেছে। ভারতীয় মসলাদার খাবারের ভীষণ ভক্ত সে এখন। কিছুদিনের মধ্যে লা ফরচুনায় ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁ শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানালো আমাদের।

ডিনার শেষে ফিরে এলাম আমাদের কটেজে। আজকে লা ফরচুনায় আমাদের শেষ রাত। আগামীকাল সকালে আমরা রওনা হবো আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে। কোস্টারিকার প্রশান্ত উপকূলীয় প্রদেশ গুয়ানাকাস্তে।

বি: দ্র: আমি লেখার বিভিন্ন জায়গায় বারবার বলেছি, কোস্টারিকার অর্থনীতি তেমন উন্নত নয়। কিন্তু অনেক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। পাহাড় পর্বত দেখে আমার নিজ দেশের কথাই মনে হয়েছে। আমরাও যদি এরকম পরিচ্ছন্ন করে রাখতে পারি আমাদের চারপাশ, আর বেসিক নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করতে পারি, তবে পর্যটন হতে পারে আমাদের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত।

লেখাঃ Sofia Nishi

দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

73026431_499309080801214_5121852103681114112_n
74615407_604237516988756_3060769724364226560_n

Tourplacebd.com