ছবির মতো দেশ ও একটি অদ্ভূত ট্রেন যাত্রা

সুপারফাস্ট গতিতে ট্রেন চলছে। মহা আরামের প্রথম শ্রেণীর কামরা। আর সুন্দর তো বটেই। এরকম ট্রেনে অনায়সে একটা দিন পার করে দেয়া যায়। যাচ্ছি সুইজারল্যান্ড এর একটি আলো ঝলমলে শহর লুজার্নে। দুপাশের স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে মুগ্ধনয়নে সুইস আল্প্স দেখছি। একসময় বরফের পাহাড় শেষ হয়ে সবুজ ঘাস, সর্ষের খেত আর ছোট ছোট ঘরবাড়ি সামনে আসতে লাগলো। মাঝে মাঝে ঘাসের মধ্যে দিয়ে কিছু সরু হ্রদ একে বেঁকে চলে যাচ্ছে। ছবির মতো দৃশ্য। আয়েশী হয়ে গা এলিয়ে দিয়ে জানালার পশে বসে আছি। এক পর্যায়ে ট্রেনের যাত্রা বিরতি হলো। পাশের সারিতে এক ভদ্রলোক এসে বসলেন। তাকে দেখে আরাম, আয়েশ , আনন্দ সব লাটে উঠে গেলো। ভদ্রলোকের পা টলছে , চোখ ঘোলা এবং ভাব ভঙ্গি অপৃকৃতস্থের মতো। বোঝাই যাচ্ছে পাড় মাতাল অবস্থায় তিনি ট্রেনে উঠেছেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হ্যালো, নাইস ওয়েদার , এনজয়িং? এসব বলা শুরু করলেন। আমি অতি কষ্টে একটা হাসি দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলাম। ফিসফিস করে আমার বরকে জিগ্যেস করলাম এখন কি করবো? সে বললো কি করবো মানে কি? আর ফিসফিস করছো কেন? তোমরা বাংলা এখানে কেউ বুঝবেনা। যা ইচ্ছা সশব্দে বলো। বললাম ওই মাতাল লোকটাকে দেখো কিভাবে যেন তাকাচ্ছে। বর বিরক্ত হয়ে বললো লোকটা কিছুই করছে না, সে নিজের মতো ঝিমাচ্ছে। সিনেমা দেখে দেখে তোমার মাথা পুরাই গেছে। বাস্তবে মাতালরা এতো ভয়ঙ্কর কিছু না… তুমি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকো। জাস্ট বি নরম্যাল। কিছু হবেনা।

Related image

পরের স্টপেজ থেকে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা উঠলেন। তার সিট ওই ভদ্রলোকের একেবারে পাশে। মহিলা নিজের সিটে বসে আমাদের সবাইকে মিষ্টি হেসে হাই হ্যালো করলেন, আমরাও করলাম। কিছুক্ষনের মধ্যে বেচারিকে করুন অবস্থার সম্মুখীন হতে হল। মাতাল লোকটি একটু পরপর উঠে বাথরুম যাচ্ছে, নিজের মনে বিড়বিড় করে কথা বলছে, ফ্যাসফেসে গলায় গান ধরছে। মহিলা মহা বিরক্ত। এক সময়ে নিজের সাথে কথা বলে বলে লোকটি বোর হয়ে গেলো। তখন সে শুরু করলো পাশের মহিলাটিকে গল্প শোনানো। মহিলার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই , কিন্তু লোকটি বলবেই। ব্যাটা নিজের হুশে নেই, কাজেই তাকে নিষেধ
করেও লাভ নেই….মহিলা হাল ছেড়ে দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললো,” টু মাচ এলকোহল , নট গুড। নট গুড এট অল। ”

একপর্যায়ে আমাদের ট্রেন যাত্রা শেষ হলো। সকলে মোটামুটি হাপ ছেড়ে বাচলামই বলা চলে। আমরা তো তবু যাত্রা কিছুটা উপভোগ করেছিলাম প্রথম দিকে, ভদ্রমহিলা তো সেটুকুও পারেন নি…. সারাটা পথ ওনাকে মাতাল লোকটির এলোমেলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ গল্প আর গান শুনতে হয়েছে। আমরা একে অপরকে বিদায় জানাচ্ছি সেসময় লোকটিও আমাদের কাছে সরে এসে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো জার্নিটা দারুন ছিল, তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ, খুব এনজয় করেছি। আমার ছেলে আসবে আমাকে নিতে, তোমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো দাড়াও। আমার বর তার সাথে হাত মিলিয়ে জবাব দিলো শুনে ভালো লাগলো তোমার ছেলের কথা, আজকে হয়তো হবেনা, নেক্সট টাইম মিট করবো, ইউ টেক কেয়ার। এরপর আমরা আমাদের লাগেজ নিয়ে নেমে গেলাম। নামার সময় বরকে দুষ্টুমি করে বললাম আহা ব্যাটা এতো শখ করে তোমাকে ছেলের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে চাইছিলো, থাকলেই পারতে।সে হাসতে হাসতে বললো তুমি কি সত্যি ভেবেছো নাকি ওর ছেলে আছে?আমার তো মনে হলো আবোল তাবোল বকেছে।

Image result for Lucerne Chapel Bridge

Chapel Bridge

বর হয়তো আরো কিছু বলতো কিন্তু তার আগেই দেখতে পেলাম একটি হ্যংলা পাতলা উনিশ, কুড়ি বছরের চশমা পরা ছেলে হাত ধরে ওই লোকটিকে ট্রেন থেকে নামালো। দুজনের চেহারার মিল আমাদের বুঝিয়ে দিলো লোকটি মাতাল হলেও মিথ্যুক নয়। অবাক হয়ে দেখলাম ছেলেটি কি সুন্দর করে বাবার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজের কাঁধে ঝোলালো। এরপর বাবার হাত ধরে স্টেশনের বাইরের দিকে হাঁটা শুরু করলো। দৃশ্যটির মধ্যে অদ্ভুত এক মায়া ছিল যা আমাদের বিস্মিত ও অভিভূত করলো। কে বলে ওয়েস্টার্ন দেশগুলোতে সতেরো আঠারো বয়স থেকেই ছেলে মেয়েরা মা বাবাকে ছেড়ে চলে যায় আর তাদের মধ্যে কোনো দায়িত্ববোধ কিছুই থাকেনা? এইতো নিজের চোখে দেখলাম একটি ছেলে তার মদ্যপ পিতার জন্য তার হৃদয়ে কতটা ভালবাসা জমা করে রেখেছে, নিজের চোখকে অবিশ্বাস কি করে করি?

নতুন শহরে পা দিয়ে অমন মায়াবী একটি মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে মনটা অন্যরকমভাবে পরিপূর্ণ হয়ে গেছিলো।তাই লুজার্নের প্রতি শুরু থেকেই এক ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করলো। এপ্রিল মাসের ছাব্বিশ তারিখ ছিল সেটি, লুজার্নে ঝকঝকে রোদ, মোটামুটি গরমকালই বলা চলে…. সবাই সুতির আরামদায়ক পোশাক পরে ঘুরছে। ব্যাপারটা বড়ই মজার! সেন্ট মোরিজ নামের সুইজারল্যান্ডের যে শহরটি থেকে আমরা এসেছি সেখানে তুমুল তুষারপাত হচ্ছিলো, কনকনে শীত। আর সেই একই দেশের আরেকটি শহরে লোকে সামারের আরামদায়ক রোদ সেঁকছে।যাই হোক, লুজার্ন এর বিশদ বর্ণনা আর দেবোনা। ছোট করে বলতে গেলে, আধুনিক ঝলমলে একটি শহর। সুইজারল্যান্ড ট্রিপের মধ্যে সবারই লুজার্ন দর্শন অন্তর্ভুক্ত থাকে কারণ এই শহরের কয়েকটি জিনিস খুবই বিখ্যাত।এর মধ্যে তেরোশো শতকে তৈরী চ্যাপেল ব্রীজ, ওয়াটার টাওয়ার, লায়ন অব লুজার্ন অন্যতম। আর আছে মাউন্ট রিগি ও মাউন্ট পিলাটোস নামের রুপবতী দু’টি পাহাড়। ওগুলো চূড়া থেকে দেখার জন্য বা চূড়ায় যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ট্রেন আছে।ওই লাল রঙা ছোট ছোট ট্রেনগুলি পাহাড়ি রাস্তার ভেতর দিয়ে যখন উপরে উঠে তখন ভীষন এডভেঞ্চার এডভেঞ্চার ভাব হয়।

আমার ব্যক্তিগত ভাবে সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে লেক লুজার্ন। বিশাল এক শিপে করে আমরা লেক লুজার্ন ঘুরেছি। ঘন্টা দুইয়ের এই জাহাজের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত আনন্দায়ক। লেক লুজার্ন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেক।আর আমরা যেহেতু সূর্যের দিনে গিয়েছিলাম কাজেই ওই আলোতে পানির রং যে কতটা অপূর্ব লাগছিলো তা ভাষায় প্ৰকাশ করা কঠিন। এতো সুন্দর নীল আর সবুজের মিশ্রণ আমি জীবনে আর কোথাও দেখিনি। এই হ্রদটি থেকে রিগি পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য মনের আশ মিটিয়ে দেখা যায়….পাহাড়ের কোলে দারুণ সব ঘরবাড়ি, হোটেল,স্টেশন।আর এদিকে পানির রং একবার নীল থেকে সবুজ, আবার সবুজ থেকে নিলে রূপান্তরিত হচ্ছে। একটু গরম অনুভূত হতে না হতেই আরামদায়ক হাওয়া বয়ে এসে মনকে শীতল করে দিচ্ছে। দুর্দান্ত এক অনুভূতি! প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ডাইনিং হলে অনেকে বসে পেট পুজো করলেও আমরা বসেছিলাম খোলা আকাশের নিচে। কারণ সেখান থেকেই চারিপাশটা দেখতে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগে। খাওয়া দাওয়া করে সময় নষ্ট করতে মন চাইছিলো না।

Image result for Lucerne lake

Lake Lucerne

আমাদের হোটেলটা ছিল চ্যাপেল ব্রিজের এর একদম পাশেই। জানালা খুললেই মুখটা আপনাতে হাসি হাসি হয়ে যেত। যদিও সেটা শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা। সুইজারল্যান্ডে অনেকগুলো কোলাহলমুক্ত গ্রাম, নৈঃশব্দের নগরী দেখার পর লুজার্ন এ এসে ওই সাশাব্দিক ব্যাস্ততা মন্দ লাগেনি। একই দেশে এতখানি বৈচিত্র দেখার সৌভাগ্য জীবনে বড় একটা আসেনা, সেজন্যই হয়তো।

লেখকঃ Sara Bushra Dooty

দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

73026431_499309080801214_5121852103681114112_n
74615407_604237516988756_3060769724364226560_n

Tourplacebd.com