ঘুরে আসুন শান্তির দেশ ভূটান

ট্যুর প্ল্যানঃ ৪ জনের
ভ্রমণ সময়ঃ অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ
ভ্রমণ স্থায়িত্বঃ ৭ দিন, ৮ রাত ( আমি আমাদের ট্যুরপ্ল্যান আর খরচ নিয়ে বলব, তারপর দিন সংখ্যা কমালে কীভাবে প্ল্যান আর খরচ চেঞ্জ হবে সে ব্যাপারেও আইডিয়া দিব )
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রঃ পাসপোর্ট, বাই রোডে গেলে ইন্ডিয়ার ট্রানজিট ভিসা (পোর্টঃ চাংড়াবান্দা/জয়গাঁও), ট্রাভেল ট্যাক্স।

তাহলে শুরু করা যাক প্রথমে প্ল্যান নিয়ে, এরপর খরচাপাতি হিসেব করছি।

ট্যুরপ্ল্যানঃ

Day-1
আমরা রাতের বাসে (পিংকি পরিবহন এসি) ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করি। সকালে বুড়িমারি পৌঁছাই প্রায় সকাল ৯টা নাগাদ। এরপর চ্যাংড়াবান্দা/বুড়িমারি বর্ডারে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে বর্ডারেই টাকা আর ডলার এক্সচেঞ্জ করে রূপিতে কনভার্ট করে নেই। পুরো ভূটানেই রূপি চলে সুতরাং এরপর আর টাকা ভাংগানো লাগবে না তবে ২০০০ রূপির নোটগুলা অনেক জায়গায় নেয় না তাই চেষ্টা করবেন ২০০০ রূপির নোটগুলি না নিতে। আমরা গিয়েছিলাম দুর্গা পূজোর ছুটিতে তাই বর্ডারে ভালোই ভীড় পেয়েছিলাম তাই একটু সময় বেশিই লেগেছিল। এরপর চ্যাংড়াবান্দা থেকে জয়গাঁও বর্ডারে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি নেই। প্রায় তিন ঘন্টায় আমরা জয়গাঁও পৌঁছে যাই, দুপুর তিনটার মত বাজে। এরপর বর্ডারে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আমরা আমাদের সাত দিন ভূটান ঘুরার জন্য দরদাম করে ট্যাক্সি ঠিক করে জয়গাঁও/ফুন্টশোলিং হতে থিম্পুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। প্রথম দিনটা জার্নিতেই যায়। থিম্পু যেতে যেতে রাত হয়ে যায়। হোটেলে পৌঁছেই ঘুম দেই।

Image may contain: mountain, sky, cloud, outdoor and nature

Day-2
এদিন আমাদের টার্গেট ছিল থিম্পু লোকাল সাইটগুলি ঘুরে দেখার। ঘুরে দেখি Memorial Chorten, Buddha Dordenma Statue, Changangkha Lhakhang Monastery, Takin Reservation zoo, Folk Heritage Museum, Tashichho Dzong, Royal Palace View Point, Clock Tower, Handicraft Market, Farmers Market etc. রাতে সৌভাগ্যবশত ক্লক টাওয়ারে আমরা একটা লোকাল প্রোগ্রাম পেয়ে যাই, প্রোগ্রামটি দেখে মার্কেটে হাল্কা ঘুরে রাতটা থিম্পুতেই থাকি।

Day-3
খুব সকালে উঠেই চলে যাই থিম্পুতে অবস্থিত ইমিগ্রেশন অফিসে। পুনাখা আর হা এর পার্মিট নিতে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, ফুন্টশোলিং থেকে ভূটান প্রবেশের সময় সবাইকে শুধু থিম্পু আর পারো শহর ঘোরার অনুমতি দেয়। এর বাইরে কোনো জায়গা ঘুরতে হলে থিম্পু থেকে অনুমতি নিতে হয়। তবে থিম্পু ইমিগ্রেশন অফিস শনি, রবি আর ভূটানিজ ন্যাশনাল হলিডের দিন গুলিতে বন্ধ থাকে। তাই অবশ্যই প্ল্যান এমনভাবে সাজাবেন যেন ছুটির দিন না পরে যায়। পার্মিট নিতে ৩০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা লাগবে। তাই আগে আগে যাবেন যাতে তাড়াতাড়ি কাজ হয়ে যায়। আমরা পার্মিট নিয়ে পুনাখার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। থিম্পু থেকে দুই-আড়াই ঘন্টার পথ। পথে Dochula Pass দেখি। এরপর পুনাখায় গিয়ে সুবিশাল Punakha Dzong দেখি। বিকালটা Fochu-Mochu River View Point আর Suspension Bridge এ কাটাই। চাইলে এখানে রাফটিংও করা যায়। রাতে আমরা পুনাখাতেই থাকি তবে চাইলে থিম্পুতেও ফেরত আসতে পারেন। আমার সাজেশন থাকবে থিম্পুতেই ফেরত আসা কারণ পরদিন পারো এখান থেকে কাছে হবে যেতে।

Day-4
সকালে উঠে পারোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। পুনাখা থেকে থিম্পু হয়ে পারো যেতে চার ঘণ্টার মত লাগবে। আমরা অবশ্য থিম্পুতে স্টপ দিয়েছিলাম Tashichho Dzong এ বিখ্যাত Thimphu Tshechu Festival দেখব বলে। ভূটানে বছরের একেক সময় বিভিন্ন ফেস্টিভাল লেগেই থাকে এখানের বিভিন্ন Dzong আর Monastery গুলিতে। তাই প্ল্যান করার সময় দেখে নিবেন কোনো ফেস্টিভালের ডেট মিলাতে পারেন কি না। আমরা মূলত এই ফেস্টিভালটাকেই টার্গেট করেছিলাম। নিঃসন্দেহে এটা অন্যতম একটা সেরা অভিজ্ঞতা হবে যদি আপনার বিভিন্ন দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি জানার আগ্রহ থাকে। ভূটানীজ ফেস্টিভালের সম্ভাব্য ডেইট পাবেন https://bhutantourstrip.com/bhutan-festival-dates/ এইখানে। এরপর আমরা পারো চলে যাই। সেখানে দেখি Paro Dzong, National Museum, Kichu Monastery, এছাড়াও আরো কয়েকটা Monastery ছিল কিন্তু অইগুলা আর এদিন কাভার করি নি কারণ সবগুলিই প্রায় সেইম টাইপেরই। রাতটা পারোর লোকাল মার্কেট ঘুরে দেখি আর পারোতেই থাকি।

Image may contain: 1 person, outdoor

Day-5
এদিন পুরোটাই রাখি Tiger Nest/Taktsang Monastery trekking এর জন্য।

Day-6
এদিনের স্পট ছিল পারো থেকে ঘণ্টা দুই এর দূরত্বে অবস্থিত হা শহর। যাওয়ার পথে দেখি বিখ্যাত Chelela Pass, আর হা তে দেখি Haa Monastery, Haa Dzong.

Day-7
পারো থেকে ফুন্টশোলিং আসি, ঘণ্টা পাঁচেকের পথ। তারপর বর্ডারে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ট্যাক্সিতে চ্যাংড়াবান্দা তারপর বর্ডার ক্রস করে রাতের বাসে ঢাকা। বাংলাদেশী সময় ৬টার মাঝে বর্ডারে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।

এই ছিল আমাদের ট্যূর প্ল্যান। তবে কেও চাইলে এটা বদলাতেও পারবেন, যেমন কেও ট্রেকিং না করলে Tiger Nest View Point দেখেই চলে আসতে পারেন। আবার চাইলে হা ভ্যালীও স্কিপ করতে পারেন। আবার ফোবজিকা ভ্যালী বা বুমথাং যোগ করে দিন বাড়তেও পারেন। আর ভূটানে এত এত Monastery আর Dzong চাইলে দুই একটা স্কিপ করতেও পারেন। আমরা মেইন মেইন গুলিই কভার করেছি। এক্ষেত্রে দিন কমিয়ে হয়তো চার-পাঁচ দিনও করতে পারেন।

এবার আসি খরচাপাতির হিসাবেঃ

ট্রাভেল ট্যাক্সঃ ৫০০ টাকা, ঢাকা টু বুড়িমারি টু ঢাকা বাস রিটার্ন টিকিট সহঃ ৩৬ সিটের এসি ২০০০ টাকা, ২৮ সিটের এসি ২৪০০ টাকা। ননএসি ১৩০০ টাকা। (যাওয়া-আসা)। বর্ডারে ঘুষ না নিলে খরচ নাই। হাতে ২০০ টাকা রাখতে পারেন যাওয়া-আসা মিলিয়ে।

এবার রূপিতে হিসাবঃ
চ্যাংড়াবান্দা থেকে জয়গাঁও ৪ সিটের ট্যাক্সি দামাদামি করে ২০০০/৪=৫০০ রূপি পার হেড পরেছিল। আমরা হোটেল আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখি, যেহেতু অন সিজন আর পূজার ছুটির কারনে অনেক রাশ ছিল। অনলাইনে যেকোনো সাইট থেকেই বুকিং দিতে পারবেন আপনার চাহিদা অনুসারে। প্রায় সব হোটেলেই গিজার আর wifi এর সুবিধা পাবেন। আমরা মোটামুটি মানসম্মত ২ স্টার হোটেল গুলি নিয়েছিলাম। থিম্পু তে ২ রাত, পুনাখা তে ১ রাত আর পারো তে ৩ রাতসহ ৬ রাতের জন্য আমাদের পারহেড গড়ে ৬*৮০০ = ৪৮০০ রূপি পড়েছিল। ডাবল বেডের রুম নিয়েছিলাম আমরা। আর ট্যাক্সির জন্য আমরা একেবারেই সাতদিনের জন্য ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। ভাড়া করেছিলাম ২০,০০০ রূপি। এখানে পার হেড আসে ২০,০০০/৪ = ৫০০০ রূপি। আর খাবারের জন্য দিন কমবেশী ৫০০ রূপি ধরে রাখতে পারেন বা চাইলে আরো কম যার যার ইচ্ছা অনুযায়ী। তবে একদিনে হলেও ভূটানীজ ট্র্যাডিশনাল ডিশ ট্রাই করবেন ( রেড রাইস্, এমা দাতসি, কেওয়া দাতসি, সুজা ইত্যাদি ) । সিম নিয়েছিলাম বি টেলিকম ১৫০ রূপি আর ২০০ রূপিতে ২জিবি ডাটা। এখানে খাওয়া আর নেট মিলিয়ে পার হেড ৭ দিনের জন্য ৩০০০ রূপি ধরতে পারেন। এবার আসি এন্ট্রি ফী নিয়ে। ভূটানের প্রয় সব মোনাস্ট্রি আর জং এর প্রবেশের জন্য প্রবেশমূল্য দিতে হয়। তালিকাটি নিচে দিয়ে দিচ্ছিঃ
Memorial Chorten: 300 rupee
Tashichho Dzong: 300 rupee
Folk Heritage Museum: 30 rupee
Takin Reservation zoo: 300 rupee
Royal Textile Museum: 50 rupee
Punakha Dzong: 300 rupee
Paro Dzong: 300 rupee
Paro National Museum: 25 rupee
Tiger Nest Taktsang Monastery: 500 rupee (অবশ্যই ট্রেক শুরুর আগে নীচে থেকেই টিকিট কেটে নিবেন)
বি.দ্রঃ মিউজিয়ামগুলি সরকারী ছুটির দিন আর সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলায় বন্ধ থাকে।

Image may contain: mountain, sky, cloud, house, outdoor, nature and water

এখন সব মিলিয়ে যোগ করলে ঢাকা টু ঢাকা সাত দিন আট রাতের ভূটান ভ্রমণে চারজন গেলে পার হেড খরচ পড়ে প্রায়ঃ ২০,০০০ টাকা। যেহেতু আমরা অন সিজন আর পূজার ছুটির সময় গিয়েছি তাই অফ সিজনে গেলে হয়তো আরেকটু কমে যাওয়া যাবে। আর যদি টাইগার নেস্ট ট্রেক আর হা ভ্যালী স্কিপ করেন তাহলে হয়তো ১৫০০০ টাকাতে কমপ্লিট করতে পারেন। বাকি খরচ নিজেদের উপর।

নিজ দেশে যেমন, বাইরের দেশেও তেমন পরিবেশ নোংরা করবেন না। ভূটান খুবই সুন্দর, সেখানের মানুষজনও পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুবই সচেতন। তাই যেখানে সেখানে ময়লা, খাবার দাবার ইত্যাদি ফেলবেন না। আর প্লাব্লিক প্লেসে স্মোকিং করলে ৫০০ রূপি জরিমানা, তাই সতর্ক থাকবেন।

লিখেছেন Saeed Alam Utsha

দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

73026431_499309080801214_5121852103681114112_n
74615407_604237516988756_3060769724364226560_n

Tourplacebd.com