এক টুকরো স্বর্গ ও শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য “সান্দাকফু”!

সান্দাকফু যেতে হলে আগে মানেভাঞ্জান যাওয়া লাগবে। আর দালালদের জ্বালায় আর মানেভঞ্জানের গাড়ি ম্যানেজ করতে না পেরে আমরা দার্জেলিং এর গাড়ি রিসার্ভ করি। ভাড়া পরে ৩ হাজার রুপি। দার্জিলিং থেকে মানেভাঞ্জান যাওয়ার গাড়ি সহজেই পাওয়া যাবে। দার্জিলিং যাওয়ার গাড়ি আগের রাতেই ঠিক কিরে রেখেছিলাম। গাড়ি হোটেলের নিচে আসে ভোর ৪.৪৫ মিনিটে। রওনা করি দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। দার্জিলিং এর কথা শুনে সবাই মহাখুশি। আমরা বলে দেই যে, দার্জিলিং আমরা ঘুরবো না। গাড়ি থেকে নেমেই মানেভাঞ্জানের গাড়ি ঠিক করে ফেলবো। কারন মানেভাঞ্জান থেকে সান্দাকফু যাওয়ার ল্যান্ড রোভার ছাড়ার শেষ সময় দুপুর ১ টা। তো দেরি হয়ে গেলে সান্দাকফু আর ঘুরা যাবে না। আনন্দিত সাথী ভাইদের মুখ ছোট হয়ে যায়। সমস্যা নেই, সামনে অপেক্ষা করছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। দার্জেলিং পৌছেই আল্লাহর রহমতে মানেভাঞ্জান যাওয়ার গাড়ি ঠিক করে ফেলি। গাড়ি ভাড়া পরে ৬০০ রুপি। দার্জেলিং থেকে মানেভাঞ্জান আনুমানিক ২৬ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগবে দেড় ঘন্টার মত।

মানেভাঞ্জান পৌছাই দুপুর ১২.৩০ মিনিটে। আমার আর আশিকুরের চিন্তা ছিলো সান্দাকফু যাওয়ার গাড়ি পাবো কিনা। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। আলহামদুলিল্লাহ। মানেভাঞ্জান নেমেই সান্দাকফু যাওয়ার জন্য গাড়ি ঠিক করে ফেলি। মানে সময় নস্ট করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সাথে যাদের এটাই প্রথম সফর তারা মোটামুটি বিরক্ত। কারন, এক গাড়ি থেকে নেমেই আরেক গাড়ি, ঘুম ভরা চোখ নিয়েই ভোরে হোটেল থেকে বের হওয়া, এক জায়গায় ঘুরা শেষ করেই আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পরা। মানে বিশ্রাম নেওয়ার সময় খুবই কম। কিন্তু আমি,আশিক আর আশিকুর আগেই একটা প্ল্যান করে রেখে ছিলাম৷ শিলিগুড়ি গিয়ে দেড় দিনের জন্য রেস্ট নিবো। যাইহোক মানেভাঞ্জান নেমেই দেখলাম রাস্তার বামদিকে একটা জায়গায় “You are welcome to Nepal” লিখা একটা সাইনবোর্ড। এই সাইনবোর্ডটা এতোদিন অন্য ট্যুরিস্টদের ছবিতে দেখেছিলাম, কিন্তু এখন আমি সেই সাইনবোর্ডের সামনে। সান্দাকফু যাওয়ার গাড়ি ঠিক করে ফেলি ৫৫০০ টাকা দিয়ে। (গাড়ি ঠিক করা নিয়ে কিছু তথ্য শেষের দিকে বলে দিচ্ছি)।

 

সান্দাকফু যেতে হলে সিংগালিলা জাতীয় উদ্যানের জন্য টিকেট করা লাগে আর এন্ট্রি করা লাগে। এন্ট্রি অফিসে ইন্ডিয়ান আর্মির কয়েকজন সদস্য বসে খবর দেখছে। তারা বললো ইন্ডিয়া-পাকিস্তান এই দুই দেশের মধ্যে গন্ডগোল লেগে গেসে। সবার চেহারায় একটা চিন্তার ছাপ। ইন্ডিয়ান আর্মির সদস্যরা আমাদের জানালো যে, আমাদের চিন্তার কোনো কারন নেই। তাও বাংলাদেশে অবস্থানরত সবার বাবা মা চিন্তা করবে। তার উপর সান্দাকফুতে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। চিন্তার পরিমান কিছুটা বেড়ে গেলো। মানেভাঞ্জানের বাজার থেকে সান্দাকফুর জন্য হাল্কা খাবার নিয়ে নেই। তারপর এন্ট্রি করে সবাই বেড়িয়ে পরি স্বপ্নের সান্দাকফুর উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে “চিত্রা” নামক একটা জায়গায় দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য থামি। আরেকটা কথা বলে রাখি, সান্দাকফুর জন্য বের হওয়ার আগের রাতে আমাদের আশিক ভাই গুগলে সান্দাকফুর আবহাওয়া দেখে আমাদের জানায়, “সান্দাকফুতে বর্তমান তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি। লাচেনে -৩/৪ ডিগ্রি ছিলো, তো এতো মোটা জ্যাকেট না নিয়ে আমরা আমাদের পাতলা জ্যাকেট গুলো নিয়ে যাই।” ওকে ভালো বুদ্ধি। মোটা জ্যাকেট গুলো ব্যাগে নিয়ে নিবো আর পাতলা জ্যাকেট পরে রওনা দিবো। কিন্তু এই ভালো বুদ্ধিই যে আমাদের যম হয়ে দাঁড়াবে তা কে জানে। চিত্রা যেয়েই ঠান্ডা আমাদের কাবু করে ফেলে। প্রচুর ঠান্ডা বাতাস৷ সবাই রাগের দৃস্টিতে বুদ্ধিমান আশিকের দিকে বার বার তাকাই। আশিক নতুন বউ এর মত তার মুখ লুকাতে ব্যস্ত। যাইহোক, দুপুরের খাবার “নুডুলস” খেয়ে বেড়িয়ে পড়ি সামনের দিকে। আকাবাকা পাহাড়ি পথে গাড়ি চলতে থাকে। ভালো রাস্তা ছিলো, কিন্তু এই ভালো রাস্তাটা অল্প সময় জন্য। এবার পালা পাহাড়ের ভয়ংকর মাটির রাস্তা। সিকিম ট্রিপে যারা গাড়ির সামনে বসার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতো, এখন তারা একে অন্যকে গাড়ির সামনে বসার প্রস্তাব দিচ্ছে। কারন ভয়ংকর উচু নিচু রাস্তার দৃশ্য সামনে থেকে দেখাটা বেশি ভয়ংকর। আঁকাবাকা ভয়ংকর পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাই “গ্যাইরি বাস”। উচ্চতা ২৭০০ মিটার (এক জায়গায় লিখা ছিলো ৩৬৩৬ মিটার)। ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতা আরো বেড়ে যায়। গাড়ির ছাদ রাখা ব্যাগ থেকে জ্যাকেট, বানর টুপি, হাতমোজা বের করে পরে ফেলি।

Image may contain: outdoor

গ্যারিবাস থেকে চা খেয়ে আবার রওনা করি সান্দাকফুর পথে। কিছু পথ অতিক্রম করার পর শুরু হয় আমার জীবনের দেখা অন্যতম খারাপ রাস্তা। গাড়ি থেকে ডানদিকে একহাত আর বামদিকে ১ হাত জায়গার পর কয়েক হাজার ফিটের খাত। সবাই চুপ। কিছু করার নাই। এখন চাইলেও ব্যাক করা যাবে না। রাস্তায় বরফ গলা পানিতে কয়েকবার গাড়ি স্লিপও খায়। বিকাল ৪.৩০ মিনিটে পৌছাই সান্দাকফুতে। সবাই কাপতে কাপতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। এবার পালা হোটেল নেওয়ার৷ প্ল্যান ছিলো শেরপা সেলেট অথবা সানরাইজ গেস্ট হাউসে থাকবো। আমি আর আশিকুর শেরপা সেলেটে যাই আর রায়হান আর আশিক যায় সানরাইজ গেস্ট হাউজে। শেরপা সেলেটের ৭ জনের জন্য নিচতলার রুমটা বেশ অন্ধকার। হোটেলের রুম থেকে বের হয়ে বাইরে দাড়াই আশিক আর রায়হানের অপেক্ষায়। সানরাইজ গেস্ট হাউজের সিড়ি থেকে আশিক আমাদের হাত নেড়ে ডাক দেয়। সবাই ব্যাগ নিয়ে চলে যাই সাইরাইজ গেস্ট হাউজের দিকে। রুম ঠিক করি ২০০০ রুপি দিয়ে। দ্বিতীয় তলায় আমাদের রুম। রুমের দুই পাশে লম্বা বড় কাচের জানালা। এই জানালা দিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পারবো,মানে রুমে বসেই। কিন্তু কথা হচ্ছে ঠান্ডা বাতাসটাই কেউ সহ্য করতে পারছে না। কি ব্যাপার, লাচেনে -৩/৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিলো কিন্তু এমন অসহ্য লাগেনি। এখানে ব্যাপার হচ্ছে ঠান্ডা বাতাসটা আসছে সরাসরি হিমালয় রেঞ্জ থেকে, আবার সান্দাকফু আর হিমালয় রেঞ্জ এর দূরুত্বটাও অনেক কম।

মনে মনে প্ল্যান করে রেখেছিলাম সন্ধ্যায় হোটেলের ছাদে অথবা সামনে বসে কফি খাবো আর আড্ডা দিবো। কিন্তু এমন অসহ্য ঠান্ডায় কাউকে যদি হোটেলের ছাদে কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেই তাহলে মারও খেতে পারি। হোটেলের রুমে ৭ জনের বিছানা আর সাথে জনপ্রতি ৩ টা করে মোটা লেপ। বিকাল থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত রুমে লেপের ভেতর শুয়ে ছিলাম। সন্ধ্যা ৭ টায় হোটেলের ম্যানেজার এসে আমাদের জানালো যে, আমাদের ডিনার রেডি, তাড়াতাড়ি না খেলে ঠান্ডা হয়ে যাবে। লেপ থেকে বের হয়ে নিচে গিয়ে আগের থেকে অর্ডার করা ভেজেটেবল ফ্রাইড রাইস খেতে বসি। খাবার থেকে ধূয়া বের হচ্ছে কিন্তু আমাদের দলের সাথী ভাইরা এই গরম খাবার বিনা দ্বিধায় গিলছে, মানে এই সদ্য বানানো খাবারের গরমের তীব্রতাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। খাদক রায়হান ভাই অর্ডার করলো “ইয়াক কারি”। বিসমিল্লাহ বলে এক টুকরো মুখে দিলাম, রাবারের মত। আপনারা চাইলে এই একটুকরো ইয়াকের মাংস চিবোতে চিবোতে বাংলাদেশ চলে আসতে পারবেন। কিন্তু আমাদের তো আরো থাকতে হবে, এতো সময়তো পাবো না। খাবার শেষ, হোটেলের বাবুর্চি আমাদের বললো, ” দাদা, আপনারা সোফাতে গিয়ে সবাই বসেন, আমি একটা পাত্রে জ্বলন্ত কয়লা দিচ্ছি”। সবাই বসে আছি ২টা বড় পাত্রে দেওয়া জ্বলন্ত কয়লা ঘিরে। পাত্রের সামনে হাত কিছুক্ষন রেখে হাত গরম করতে না করতেই পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, আবার পা গরম করতে করতে হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এটা আবার কি শাস্তি? হোটেলের ম্যানেজার আমাদের বললো, “গত দুইদিন যাবত ঠান্ডার সাথে সাথে প্রচুর বাতাস আসছে, আমাদেরও সমস্যা হচ্ছে”। আমি ভয়ের কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, ” দাদা, সকালে সূর্যাদয়, হিমালয় রেঞ্জ, পৃথিবীর ৪ টা সুউচ্চ পাহাড় (এভারেস্ট,কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, মাকালু) দেখতে পারবো তো?” তিনি বললেন, “পারবেন কিন্তু ভোর পাচটায় ছাদে গিয়ে পূর্ব দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করা লাগবে, কিন্তু ঠান্ডা এবং বাতাসের যে গতি আর আপনাদের যে অবস্থা দেখছি, মনে হয় না পারবেন”।

Image may contain: sky and outdoor

দলের সাথী ভাইরা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “আবার ভোর পাচটায়? আর কি বাকি আছে?”। সবাই অনেক বিরক্ত। কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে রাত ৮.৩০ মিনিটে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ি। হোটেলের ম্যানেজারকে ডাক দিয়ে জনপ্রতি আরো একটা করে কম্বল আনাই। মানে আগের থেকে থাকা জনপ্রতি ৩টা লেপ, পরে আনা ১টা কম্বল আর আমাদের গায়ে থাকা ফুলহাতা গ্যাঞ্জি, সোয়েটার আর মোটা বস্তার মত জ্যাকেট, বানর টুপি, হাতমোজা, পায়ে দুইটা মোজা। বুঝতেই পারছেন আমাদের অবস্থা। সবাই রাত ৯টায় লেপের ভিতর থেকে একে অন্যের সাথে কথা বলতে থাকি। কেউ ভোরে উঠবে না। আমরা যারা ভোরে উঠবো বলে ঠিক করেছি, তারা অন্যদের সাহস বাড়ানোর জন্য প্রেরণা দিতে থাকি, যেমনঃ “ভাই আমাদের সান্দাকফু ট্রিপের ৫টা এচিভমেন্ট, এচিভমেন্টের কথাগুলো চিন্তা কর৷ এতো কস্ট করে এই পর্যন্ত আসলাম, এখন যদি হিমালয় রেঞ্জ আর সূর্যাদয় না দেখতে পারি তাহলে এই কস্টের কি দাম? নিজেকে কি বলে স্বান্তনা দিবি? কয়জন ভবিষ্যতে আবার সান্দাকফু আসবি? হায়াত মতের কথা কে জানে? তো আমরা সবাই একসাথে সূর্যাদয় আর হিমালয় দেখার জন্য ভোরে উঠবো,ওকে?” এই ঠান্ডায় আমরা এতো কস্ট করে ভাষন দিলাম, সবাই আমাদের কথায় সম্মতিও মিলালো কিন্তু আলোচনা সভার শেষে কয়েকজন জানিয়ে দিলো যে তারা এতো ভোরে উঠতে পারবে না। ব্যর্থ আলোচনা সভা শেষে সবাই ঘুমিয়ে পরলো। আমি রাত ৪.৩০ থেকে ৪.৪৫ পর্যন্ত এই ১৫ মিনিটে ৫ টা এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু এলার্মের ১০ মিনিট আগেই কাশতে কাশতে ঘুম থেকে উঠি। কাশির আওয়াজে ইমন ঘুম থেকে উঠে বলে, “রিফাত উঠসোস?” ইমনের আওয়াজ পেয়ে আমি খুশি হয়ে যাই। এই ইমনই ভোরে ঘুম থেকে না উঠার আন্দোলনের ঘোষনা দিয়েছিলো। কিন্তু সেই ইমন ঘুম থেকে উঠেছে। আসোলে আমি চেয়েছিলাম আমাদের গ্রুপের সাতজনই একসাথে সূর্যাস্ত আর হিমালয় রেঞ্জ দেখবো, মনে মনে দোয়াও করেছি সবার সুস্থতার জন্য। হাত মোজাটা খুলে জুতার ফিতা বাধতে বাধতেই রায়হান লেপের ভিতর থেকে একটাই শব্দ করলো, আর তা হলো “উঠসোস?”।

Image may contain: sky, cloud, twilight, tree, outdoor and nature

ভোরে ঘুম থেকে না উঠার আন্দোলনে রায়হানের ভূমিকা ছিলো ” সাপের এবং ব্যাঙ উভয়ের গালে চুমু দেওয়া”। আমি আরো খুশি। রায়হান বললো সে বাকি সবাইকে ঘুম থেকে উঠানোর চেস্টা করবে, আমাকে আর ইমনকে ক্যামেরা,ট্রাইপড নিয়ে ছাদে যেতে। আমি ছাদের গেট খুলে দেখি কালো আকাশের পূর্ব দিকে একটা কমলা রঙ এর রেখা, মানে ওই দৃশ্যের সৌন্দর্য্য আমি ভাষায় বুঝাতে পারবো না। ছাদে উঠলাম কিন্তু তীব্র বাতাসের জন্য দাঁড়ানোটা সত্যিই কস্টকর। ছাদে আমরা দুইজনই। ছাদে আগের থেকে থাকা একটা টেবিলে ক্যামেরা আর ট্রাইপড সেট করার সময় লক্ষ্য করলাম জুতার ফিতা বাধার সময় আমার হাতমোজাটা ফেলে এসেছি আর হাতমোজা ছাড়া হাত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাত অবোশ হয়ে যাবে। ইমনকে নিয়ে রুমে গেলাম হাতমোজা আনার জন্য, গিয়ে দেখি আকিব ছাড়া বাকি সবাই রেডি হচ্ছে। মানে ভোরে না উঠার আন্দোলনকে আমরা প্রতিহত করতে পেরেছি। খুশি মনে হাতমোজা নিয়ে আমি দ্রুত ছাদের দিকে রওনা করলাম। আমি জানতাম দলের বাকি সাথী ভাইরা আমার পিছনেই আছে। ছাদে গিয়ে ট্রাইপড লাগাচ্ছি এমন সময় হিমালয় থেকে আসা কয়েকশো কিলোমিটার বেগের বাতাসে ছাদের রেলিং হিসেবে লাগানো বাশ জোরে জোরে কাপছে, আমি ভেবেছিলাম দলের সাথী ভাইরা চলে এসেছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, এই বিশাল ছাদে, এই অন্ধকারে আমি একা। আমি ভয় পেয়ে যাই। বাতাসের ভয়ংকর আওয়াজ আর ছাদের রেলিং হিসেবে ব্যবহার করা বাশের নড়াচড়ায় ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক, তার উপর আমি একা। বাতাসের বেগে ছাদে রাখা টেবিলটা দুই তিনবার কাত হয়ে পড়ে যায়। আমি টেবিলটা ঠিক করে টেবিলের নিচে বসে থাকি। দলের সাথী ভাইরা আসে ১০/১৫ মিনিট পর। তাদের দেখে টেবিলের নিচ থেকে বের হয়ে সূর্যদয়ের টাইমল্যাপস নেওয়ার জন্য ক্যামেরা লাগিয়ে আমরা চুপ করে বসে থাকি। কিছুক্ষন বসে থাকার পর সূর্য আসতে আসতে বের হতে থাকে। আলহামদুলিল্লাহ। আমি সূর্যদয়, সূর্যাস্ত খুবই পছন্দ করি আর সান্দাকফুর সূর্যদয় আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর সূর্যদয়। সেই সৌন্দর্য্য বর্ননা দেওয়ার মত ক্ষমতা আমার নেই। ঠান্ডা বাতাসে আমাদের কস্ট হচ্ছে কিন্তু কেউ ছাদ থেকে নিচে নামছি না। ক্যামেরার চার্জ প্রায় শেষে দিকে। ক্যামেরা বন্ধ করে দেই আর অপেক্ষা করি এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য। মেঘগুলো সরে গেলেই দেখতে পারবো। কিছুক্ষন পর আসতে আসতে আকাশ আবার মেঘলা হতে শুরু করলো। আল্লাহর রহমতে প্ল্যান মত সবই তো হলো, কিন্তু এভারেস্ট আর কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা তো পেলাম না। তবু্ও আলহামদুলিল্লাহ বলে ক্যামেরা,ট্রাইপড ব্যাগে ভরে যেই রুমের দিকে রওনা করবো তখনই দেখি মেঘ কিছুটা সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে, তার কিছুক্ষন পর উত্তর দিকের মেঘ সরে গিয়ে আরো কয়েকটা সুবিশাল পাহাড়ের সারি দেখা যায়। এখান থেকেই কোনোটা এভারেস্ট, মাকালু, লোৎসে। কিন্তু অনুমান করার সময়-সুযোগই পাইনি। মিনিট পাচেকের মধ্যে আবার হারিয়ে গেলো মেঘের ভিতর। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের খালি হাতে ফেরত পাঠাবে না।

Image may contain: sky, cloud, tree, outdoor and nature

আকিব ছাড়া আমরা সবাই ছাদে। আসলে সান্দাকফুতে আকিব ছিলো বাংলাদেশের দূরপাল্লার বাসের গন্তব্যের মত, যেমন- সান্দাকফু-লেপের ভিতর- রাতের খাবার- লেপের ভিতর- মানেভাঞ্জান। সবাই খুশি মনে রুমে গিয়ে লেপের ভেতর ঢুকে পরি। রায়হান ওয়াশরুমে গিয়ে বিপদে পরে যায়। কারন বালতির পানি বরফ। রায়হান ওয়াশরুম থেকে চিৎকার করে আমাদের কাছে টিস্যু চায়। আমরা শুনেও না শুনার ভান করে বিনা কারনে ওকে এক ধরনের শাস্তি দেই। মানে সফল একটা ট্রিপ হয়েছে তাই সবার মনে রঙ লেগেছে। কিছুক্ষন পর রায়হানকে টিস্যু দিয়ে উদ্ধার করে আমাদের ব্যাগ গুছিয়ে নেমে পরে হোটেলের নিচের তলায়। অপেক্ষা করতে থাকি গাড়ির ড্রাইভারের অপেক্ষায়। আগের দিন ড্রাইভারকে বলে দেই সকাল ৮ টায় আসার জন্য, কিন্তু ৭ টায় আসতে বললে ভালো হতো। দলের কয়েকজন হোটেলের বাইরে ড্রাইভারের অপেক্ষা করতে থাকি ভয়ংকর রাস্তার দিকে তাকিয়ে, আর বাকি সাথী ভাইরা হোটেলে বসে মিনি কনসার্ট উপভোগ করে, মানে ম্যানেজার আর বাবুর্চির গান শুনে। উনারা কণ্ঠশিল্পী হলে অনেক ফেমাস হয়ে যেতো। সকাল থেকেই স্নো ফল পরা শুরু হয়, কিন্তু সিকিমের লাচেনের মত তীব্র স্নো ফল না। সকাল ৮.১০ মিনিটে ড্রাইভার আসে। সাথে সাথে ব্যাগ গাড়ির ছাদে তুলে রওনা করি মানেভাঞ্জানের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার সময় গ্যারিবাসে থেকে সকালের নাস্তা মানে “নুডুলস” খেয়ে কিছুক্ষন বসে আড্ডা দেই। আবার গাড়ির চাকা ঘুরতে শুর করে। গাড়ির পিছনে সবাই গল্প করছে আর সামনে আমি আর আশিক চুপ করে বসে থাকি। সামনের রাস্তা দেখে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলি। কিছুক্ষন পর পৌছাই চিত্রে। চিত্রে নেমে ১৫/২০ মিনিট থাকি। গাড়িতে উঠবো, এমন সময় নামে বৃস্টি। মানেভাঞ্জান পৌছে আমাদের গাড়ির ড্রাইভার থেকে বিদায় নিয়ে নেমে পড়ি দার্জিলিং যাওয়ার গাড়ি খোজার জন্য। গাড়িও পেয়ে যাই কিন্তু এক দালাল এসে ড্রাইভারের সাথে কি কথা বলার পর ড্রাইভার ভাড়া চায় ১৫০০ রুপি। মানে আসলাম ৬০০ রুপি দিয়ে কিন্তু এখন চাচ্ছে ১৫০০ রুপি। তারা বুঝতে পেরেছে যে বৃস্টির জন্য আমরা বিপদে পরেছি,সবার সাথে এতো গুলো ব্যাগ আবার সান্দাকফু থেকে মাত্র এসেছি, তার মানে সবাই ক্লান্ত। তো এটাই সুযোগ ভাড়া বেশি আদায় করার। আমরা একটা দোকানের নিচে দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষন পর আরেকটা গাড়ি আসে। ওই গাড়িও দার্জিলিং যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে যায় কিন্তু কোথা থেকে সেই দালাল এসে আবার ড্রাইভারকে কি জেনো বলে, তারপর এই ড্রাইভারও যাওয়ার জন্য মানা করে দেয়। ড্রাইভার আমাদের বলে সেই দালালের সাথে কথা বলে গাড়ি ঠিক করার জন্য। কিন্তু আমরা ওই দালালের সাথে কোনো কথাই বলি না। সে দূর থেকে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চেহারা দেখে অনেক রাগ হচ্ছিলো। কিন্তু কথায় আছে না, “রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন”৷ সেই দালালটা হয়তো জানে না, আমরা তার মত কয়েকটা দালালকে দিনের আকাশে রাতের তারা দেখিয়ে এই পর্যন্ত এসেছি। তো রাগ কমিয়ে আমি আর আশিকুর কিছুক্ষন কথা বলি। আশিকুর একাই বৃস্টিতে ভিজেই সামনের দিকে চলে যায়। কিছুক্ষন পর আশিকুর এসে জানায় সুখিয়া পর্যন্ত যাওয়ার জন্য গাড়ি রিসার্ভ করা হয়েছে। সুখিয়া থেকে দার্জেলিং সহজেই যাওয়া যাবে। আমরা গাড়িতে ব্যাগ তুলার সময় দেখলাম দালাল বাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। উনাকে আমরা সবাই হাসি মুখে বিদায় সূচক হাত দেখিয়ে রওনা করলাম সুখিয়ার উদ্দেশ্যে। সুখিয়া পৌছাতে সময় লাগে ৩০ মিনিটের মত। গাড়ি থেকে সুখিয়া নেমে যাদের ইচ্ছা ছিলো দার্জিলিং যাওয়ার তারা দার্জিলিং চলে যায়, মানে দার্জিলিং হচ্ছে বোনাস। আমি, আশিকুর আর রেদোয়ান চলে যাই শিলিগুড়ি। কারন পরের দিন রেদোয়ান দিল্লি যাবে, তো তার কিছু শপিং করা লাগবে। সুখিয়া থেকে মিরিকের রাস্তা ধরে বিকাল ৪.৩০ মিনিটে চলে যাই শিলিগুড়ি। ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি এসে যে হোটেলে ছিলাম, ওই হোটেলেই রুম নিয়ে গোসল করেই বের হয়ে পরি ভেনাস মোড়ের উদ্দেশ্যে। ভেনাস মোড় নামতেই দার্জেলিং অবস্থানরত আশিক আমাদের কল দিয়ে জানায় যে তারা শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করেছে, মানে দার্জিলিং ঘুরে তাদের মন খুব অল্প সময়তেই ভরে গেছে। দার্জেলিং থেকে তারা শিলিগুড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে চলে আসে ভেনাস মোড়ে। রাতের খাবার খেয়ে আমরা হোটেলে গিয়ে কিছু হিসাব নিকাশ করে ফেলি। অফিশিয়ালি আমাদের ট্রিপ শেষ। এবার পালা ট্রিপের ফান্ডের বেচে যাওয়া টাকা সবার মধ্যে সমান ভাবে ভাগ করে দেওয়ার।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বেরিয়ে পরি শপিং এর জন্য। সারাদিন শপিং করে, মুভি দেখে রাতে হোটেলে এসে সবার ব্যাগ প্যাক করে ঘুমিয়ে পরি। ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে ২০০০ রুপি দিয়ে গাড়ি ঠিক করি চ্যাড়াবান্ধা বর্ডার যাওয়ার জন্য। গাড়ি ঠিক করার সময় ড্রাইভারের কথা শুনে আমরা মনে করেছিলাম ভদ্রলোক বর্ডারের রাস্তা চিনে, কিন্তু আসলে তিনি রাস্তা চিনতো না। আমরা দুপুর ১ টায় রওনা করি। আমাদের ইচ্ছা ছিলো বর্ডার পৌছে বুড়ির হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে উঠবো। আমাদের বাস বিকাল ৫ টায়। মানে সাড়ে ৩ টা, ৪ টায় বাংলাদেশ ঢুকে পরবো। গাড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করে। আমরা কথা বলতে বলতে বর্ডারের দিকে যেতে থাকি। নাটকীয় সফর শেষ। কিন্তু না, নাটকীয় সফরের শেষ নাটক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বেলা ৩.৩০ মিনিটে আশিকুর ড্রাইভারকে বলে যে, আর কত সময় লাগবে, এতোক্ষনে তো পৌছে যাবার কথা। ড্রাইভার জানায় আর ১৫/২০ মিনিট লাগবে। কিন্তু রাস্তা দেখে তো মনে হচ্ছে না যে আমরা এই রাস্তা দিয়ে এসেছি। ১৫/২০ মিনিট পর মানে আনুমানিক ৪ টার দিকে ড্রাইভারকে বলি কাউকে জিজ্ঞেস কিরার জন্য। রাস্তার এক মোড়ে গাড়ি থামিয়ে এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করি যে, কোন রাস্তা দিয়ে যাওয়া লাগবে। উত্তরে তিনি বলেন, “দাদা, বর্ডার তো ৩০ কিলোমিটার পিছনে ফেলে এসেছেন”। আমাদের বাস বিকাল ৫ টায়, আর তখন বাজে বিকাল ৪ টা। সবার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। এখনতো আর এমন নাটক ভালো লাগছে না। ৩০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে সময় লাগবে আনুমানিক এক ঘন্টা, সাথে দুই বর্ডারের ঝামেলা। মাথা ঘুরাচ্ছে। কল দেই আমাদের বাস কাউন্টারে আর বলে দেই আমাদের অবস্থা, সাথে এটাও বলে দেই যে আমাদের জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করার জন্য। গাড়ির ড্রাইভার ঘন্টা প্রতি ৮০/৯০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাতে থাকে। দূরত্ব বাকি আর ৪ কিলোমিটার যা পাড়ি দিতে লাগবে আনুমানিক ৮/১০ মিনিট। কিছুদূর গিয়ে দেখি গাড়ির লম্বা লাইন। মানুষদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, এটা ট্রেনের লাইন। ড্রাইভারের ভূলের জন্য আজকে আমাদের এই অবস্থা। ট্রেন আসার নাম নাই। ৫ মিনিট পর ট্রেন আসে, কিন্তু ট্রেন যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। বহুল প্রতিক্ষার পর ট্রেন চলে যায় আর আমরা আমাদের নাটকীয় সফর শুরু করি। আপনারা যারা চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়া গিয়েছেন তারা হয়ত দেখেছেন যে, বর্ডারে টুরিস্টদের জন্য আলাদা রাস্তা আর মাল বোঝাই ট্রাক, লরি চলাচলের জন্য আলাদা রাস্তা। আমাদের সম্মানিত ড্রাইভার টুরিস্টদের যাওয়ার রাস্তা দিয়ে না যেয়ে মাল বোঝাই ট্রাকের রাস্তা দিয়ে বাতাসের গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। একদম সোজা রাস্তার শেষ মাথায় বাংলাদেশের পতাকা দেখা যাচ্ছে। আমরা সবাই চিৎকার করে ড্রাইভারকে বলি যে গাড়ি থামানোর জন্য। কারন এটা ভূল রাস্তা, তার উপর ওই সময় কাশ্মিরের পুলওয়ামাতে হামলার পর বর্ডারে কড়া নিরাপত্তা। ড্রাইভার আমাদের ৬ জনের চিৎকারে গাড়ি ব্রেক করে ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিসের টিনের ঘরটার সামনে। গাড়ি মোটামুটি ৬০ ডিগ্রি এংগেলে ঘুরে যায়। মানে আর ১০/২০ সেকেন্ড সামনে গেলেই ইন্ডিয়ার এক্সিট সিল ছাড়াই বাংলাদেশে ঢুকে পরতাম। বিএসেফের কয়েকজন সদস্য এসে ঝারি মেরে ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে বের করে। আমরা বিএসেফের সদস্যদের ড্রাইভারের ভূলের কথাটা বলি আর তারা আমাদের বলে যে, “এভাবেই আত্মঘাতি হামলা হয়ে থাকে, এখন আপনারা তাড়াতাড়ি ইমিগ্রেশনের লাইনে দাড়ান” । যাই হোক আল্লাহর রহমতে বড় ধরনের বিপদ থেকে বেচে গেলাম। আমরা সময় নস্ট না করে ইন্ডিয়ান এক্সিট সিল নেওয়ার জন্য ইমিগ্রেশনের লাইনে দাড়াই। বর্ডার বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে। দেখলাম এক বিএসএফ সদস্য বর্ডারের ইন্ডিয়ার পতাকা নামিয়ে ভাজ করছে। ইমিগ্রেশনের লাইনে আমাদের গ্রুপই সবার পিছনে আর ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশে ঢুকার শেষ মানুষটিই হচ্ছে আমি। দুই বর্ডারের কাজ শেষ, বাংলাদেশের সাইডে আমাদের বাস কাউন্টারের লোকজন আমাদের খুজচ্ছে। তাদের আশ্বাস দিলাম ভাই আর চিন্তা নেই, আমি চলে এসেছি। ঢুকে পরি নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে। জ্বি, ৯ দিনের সিকিম আর সান্দাকফুর নাটকীয় সফরের এখানেই সমাপ্তি।

বাংলাদেশ থেকে রওনা করার সময় সফরের প্রথম নাটক শুরু হয় জ্যামের জন্য আমাদের ব্যাগ বস্তা নিয়ে নৌকা দিয়ে বাবুবাজার থেকে সোয়ারী ঘাট পর্যন্ত আসা আর সেই নাটক শেষ হয় ড্রাইভারের ভূল দিয়ে।

কিভাবে যাবেন আর কি করবেনঃ
***মানেভাঞ্জান যাওয়ার গাড়িঃ
শিলিগুড়ি থেকে মানেভাঞ্জান যাওয়ার গাড়ি আছে। রিসার্ভ করেও যেতে পারেন আবার শেয়ার করেও যেতে পারেন। আমার জানা মতে শিলিগুড়ি থেকে সান্দাকফু শেয়ার বেসিসে যাওয়ার জন্য আনুমানিক ২৫০ থেকে ৩০০ রুপির মত লাগতে পারে। আবার গ্যাংটকের দারুলিয়া স্ট্যান্ড থেকে দার্জেলিং যেতে পারেন, ভাড়া ২৫০০-৩০০০ রুপি, দার্জেলিং থেকে মানেভাঞ্জানের শেয়ার জিপ ভাড়া ৬০/৭০ রুপি।

***সান্দাকফু যাওয়ার গাড়িঃ
সান্দাকফুতে যেতে হলে আপনাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো মানে ১৯৪৮ সালের “ল্যান্ড রোভার” গাড়ি দিয়ে যাওয়া লাগবে। মানেভাঞ্জান বাজার থেকেই গাড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু দুপুর ১ টার আগে মানেভাঞ্জান যাওয়ার চেস্টা করবেন। এক রাত থাকা সহ গাড়ি ভাড়া ৫০০০ রুপি।

***টিকেটঃ
সান্দাকফু যেতে হলে শিংগালিলা জাতীয় উদ্যানের টিকেট করা লাগবে। জনপ্রতি ১০০ রুপি। যে গাড়ি দিয়ে যাবেন ওইটার জন্যও ১০০ রুপির টিকেট করা লাগবে। ভিডিও ক্যামেরার জন্য ২০০ রুপি, স্টিল ক্যামেরার জন্য ১০০ রুপি দেওয়া লাগে। সবার পাসপোর্ট এর তথ্য একটা খাতায় এন্ট্রি করা লাগে।

***যাওয়ার সময় কোথায় কোথায় থামবেনঃ
সান্দাকফু যাওয়ার রাস্তাটাই যেমন ভয়ংকর তেমন যাওয়ার পুরোটা পথ জুড়েই চোখে পরবে অনেক সুন্দর জায়গা। যেমনঃ চিত্রে, টংলু, টুম্লিং, কালিপোখরি ইত্যাদি। ড্রাইভারকে আগেই বলে রাখবেন এইসব জায়গায় ১০/১৫ মিনিটের ব্রেক নিবেন। আরেকটা কাজ করতে পারেন, যাওয়ার সময় ২ টা জায়গায় আর আসার সময় ২ টা জায়গায় থামতে পারেন। তাহলে সময়ের ভালো ব্যবহার হবে।

Image may contain: people standing, mountain, sky, outdoor and nature

***ট্রেকঃ
সান্দাকফুতে যাওয়ার জন্য গাড়ি থেকে হেটে, ট্রেক করে যাওয়াটা বেশি ভালো। স্থানীয়দের মতে ট্রেক করে উঠতে হলে উপযুক্ত সময় অক্টোবর, নভেম্বর। ট্রেক করে উঠার তথ্য আমার তেমন জানা নেই।

***কাপড়ঃ
সান্দাকফু যাওয়ার সময় ভালো মোটা জ্যাকেট, ট্রেক করার জন্য ভালো জুতা নিয়ে নিবেন।

***হোটেলঃ
সান্দাকফুতে ভালোমানের কিছু হোটেল আছে। সানরাইজ গেস্ট হাউজ এবং শেরপা সেলেট এর ভিউ অনেক সুন্দর৷ সানরাইজ গেস্ট হাউজ সান্দাকফুর সবচেয়ে উঁচুতে আর এই হোটেলের ছাদ থেকে আপনারা হিমালয় রেঞ্জ এবং সূর্যদয় এবং সূর্যাস্তের ভালো ভিউ পাওয়া যায়। হোটেল থেকে মানি রিসিট নিয়ে নিবেন। যেহেতু সান্দাকফু নেপালের অংশে পড়েছে তাই ফেরার পথে কালিপখরিতে অনেক সময় সান্দাকফুতে যে হোটেলে ছিলেন তার মানি রিসিট দেখতে চায়। তাই সান্দাকফুর হোটেলের মানি রিসিট মনে করে নিয়ে নিবেন।

***খাবারঃ
সান্দাকফুতে আপনার মন মত খাবার পাবেন না। তাই যাওয়ার সময় মানেভাঞ্জান বাজার থেকে আপনার ইচ্ছামত হাল্কা খাবার দাবার নিয়ে নিবেন। আর যারা হালাল খাবার খেতে চান তারা সান্দাকফুতে ফ্রাইড রাইস, নুডুলস ইত্যাদি খেতে পারেন।

***নেটওয়ার্কঃ
সান্দাকফুতে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই বললেই চলে। যাওয়ার সময় বাসায় বলে দিতে পারেন যে, ২/১ দিন নেটওয়ার্ক এর বাইরে থাকবেন। মোবাইল, ক্যামেরার জন্য পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে নিবেন।

***টাকার হিসাবঃ
আমাদের ট্রিপ প্ল্যান ছিলোঃ
১ম দিনঃ শিলিগুড়িতে রাত থেকে পরের দিন গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া
২য় দিনঃ গ্যাংটকে সিটি ট্রিপ
৩য় দিনঃ নর্থ সিকিমের লাচুং
৪র্থ দিনঃ নর্থ সিকিমের লাচেন
৫ম দিনঃ গ্যাংটকে থাকা
৬ষ্ঠ দিনঃ সান্দাকফুর যাওয়া এবং রাতে থাকা
৭ম দিনঃ সূর্যদয় আর হিমালয় রেঞ্জ দেখে দার্জিলিং হয়ে শিলিগুড়ি রওনা
৮ম দিনঃ শিলিগুড়িতে ঘুরাঘুরি করা
৯ম দিনঃ শিলিগুড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করা।
ট্রিপের প্রথম দিন থেকে সপ্তম দিন পর্যন্ত আমাদের সকলের থাকা,খাওয়া,ঘুরা বাবদ জনপ্রতি ৮২০০ রুপি খরচ হয়েছে।

লেখাঃ Rezwan Siddique Rifat

দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

73026431_499309080801214_5121852103681114112_n
74615407_604237516988756_3060769724364226560_n

Tourplacebd.com