এই শীতে ঘুরে আসুন বাংলাদেশের নৈস্বর্গিক হাওর

তারিখটি ছিল ৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত। আদি ঢাকার বংশাল থেকে মাইক্রোবাস স্টার্ট। পথের মাঝে নানা জায়গায় টি ব্রেক দিতে দিতে ভোর ৫টায় পৌঁছাই কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী। ফোন পেয়ে আগেই বাজারে এসে অপেক্ষায় ছিল দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের অন্যতম সদস্য তরিকুল। তাকে সঙ্গে করে চলে যাই ইন্দা গ্রামের নৌঘাটে। বাজার-সদাই চুলা পাতিল নিয়ে চড়ি ট্রলারে। সব ঠিকঠাক, মাঝি ট্রলার ভাসাল নরসুন্দা নদীর খালে। ট্রলার চলতে চলতে খাল পেরিয়ে ঘোড়া উতরা নদী ছাড়িয়ে নিকলির ছাতিরচর পানে। এরই মধ্যে সকালের নাশতার জন্য খিচুড়ি রান্নার কসরত শুরু।

যেতে যেতে একসময় দূর থেকেই চোখে ধরা দেয় ডুবোচরে জেগে থাকা সারি সারি হিজল-কড়চ গাছ। এ এক অনিন্দ ভালো লাগার হাতছানি। সামনে যেতেই চোখ সবার কপালে। বাঁকাত্যাড়া শত শত গাছ। বছরের ছয় মাস প্রায় ডুবে থেকেও বেঁচে থাকার নামই হিজল-কড়চ গাছ। চরটা অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। আকাশপানে তাকিয়ে দেখি নীলের বদলে ফিরোজা।

দূরের শুভ্র মেঘমালা দেখে মনে হয় এ যেন কোনো পর্বতচূড়া! সব মিলিয়ে ভোরের হাওয়ায় নিকলি হাওড়ের আকাশটা অন্য রকম ভালো লাগার। এ রকম মায়াবী নয়নাভিরাম পরিবেশে গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে হাঁটুপানিতে হেঁটে বেড়াই। হাওড়ের ঝিরঝির বাতাসে হ্যামোক ঝুলিয়ে দোল খাই। কথায় আছে না, সকালের হাওয়া-লাখ টাকার দাওয়া। কে চায়? বিনা পয়সায় সেই সুযোগ ছাড়তে। জীবনের মানে খুঁজে পেতে চাইলে ছাতিরচরের জুড়ি নেই।

এরই মধ্যে কলাপাতায় খিচুড়ি রেডি। ইচ্ছেমতো গোগ্রাস করে ছুটলাম এবার অষ্টগ্রাম হাওড়ের পথে । নিকলি বেড়িবাঁধ পাশ কেটে ট্রলার চলে মোজনা বিলে। ভাসতে ভাসতে বিশাল হাওড়ের বুকে। কূল নেই কিনার নেই, নেই কোনো জনমানবের বসতি। সাগর আর হাওড় এ দুয়ের পার্থক্য যেন বোঝা বড় দায়। কিশোরগঞ্জে রয়েছে প্রায় ৯৭টি ছোটবড় হাওড়।

এসব হাওড় নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন বিল-হাওড়ের সঙ্গে মিশে একাকার। দেশের মিঠাপানির মাছের চাহিদা অনেকাংশই মেটে এসব হাওড়ের জলাশয় থেকে। হাওড়ের মুগ্ধতায় ভর করে ট্রলার চলছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগবে অষ্টগ্রাম পৌঁছতে। এ দীর্ঘ সময়ে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দামালরা নেচে-গেয়ে উল্লাস করে। দুপুরের রান্নার জন্য রফিক-নাজমুল হাঁসের চামড়া ছিলে। মাঝেমধ্যে জেলে নৌকার দেখা মেলে। তাদের কাছ থেকে কেনা হাওড়ের টাটকা চিংড়ি ভাজায় রসনা মেটে। পানকৌড়ির ঝাঁক ভ্রমণানন্দ বাড়িয়ে দেয়। ভাসতে ভাসতে ট্রলার পড়ল ধলেশ্বরীর বুকে। প্রমত্তা ধলেশ্বরী নদী। অথচ নারায়ণগঞ্জে এসে চরম মার খেয়েছে।

ঘড়ির কাঁটায় প্রায় দুপুর ১২টা। চোখে আটকায় অষ্টগ্রামের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সেতুর উপরে। নজরকাড়া সৌন্দর্যমণ্ডিত সেতুটি। দেখেই চোখ জুড়াল। ট্রলার এসে থামে থানা ঘাটে। নেমে যাই পানিতে। দে-ছুটের দামালরা ডুব সাঁতারে মেতে ওঠে। জুমার নামাজের তাড়া। যেতে হবে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে হজরত কুতুব শাহ জামে মসজিদে। আর দেরি নয়।

নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে ছুটলাম অটোতে। মসজিদটি প্রথম দর্শনেই তৃপ্তিবোধ হলো। ইমাম সাহেবের বয়ান চলছে। যাওয়ার সময় অটোচালক জানিয়েছিলেন, মসজিদে বসলে নাকি চোখে ঘুম চলে আসে। তার কথায় মুচকি হেসে মিথ ভেবেছিলাম। কিন্তু একি হায়! আমার চোখেও যে, যাক আর না লিখলাম। নামাজ শেষে সুলতানি আমলের তৈরি মসজিদটি ঘুরে ঘুরে দেখি।

১৬ শতকের তৈরি মসজিদটি বিখ্যাত দরবেশ হজরত কুতুব শাহ (র.)-এর নামে রাখা হয়েছে। তত্কালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন সুলতানি স্থাপনা এ কুতুব শাহ মসজিদ। প্রায় ৪৫০ বছরের অনন্য স্থাপত্য। মসজিদটির নির্মাণকাল লেখা কোনো শিলালিপি না পাওয়ায় এর সঠিক সময়কাল জানা যায় না।

তবে বেশির ভাগ প্রত্নতত্ত্ববিদ মসজিদটির স্থাপত্যরীতি ও নির্মাণশৈলী দেখে ১৬ শতকে সুলতানি আমলের বলেই ঐকমত্য পোষণ করেন। মসজিদটির পাঁচটি সুদৃশ্য গম্বুজ রয়েছে। এর দেয়ালে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য। মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি কবর। ধারণা করা হয় এটি হজরত কুতুব শাহ (র.)-এর সমাধি। মসজিদটির রয়েছে চারটি মিনার। পাঁচটি প্রবেশপথ।

১৯০৯ সালে তত্কালীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুতুব শাহ মসজিদটি সংরক্ষিত হিসেবে নথিভুক্ত করে। এরপর চলে যাই অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনির চেখে ইকুরদি গ্রামের সুস্বাদু মুড়লি খেতে। এ মুড়লির বিশেষত্ব ৭ ইঞ্চি লম্বা, যা দেশের অন্য কোথাও মেলে না। মুড়লি আর গাছপাকা চাম্পা কলা খেয়ে সঙ্গে নিয়ে ফিরলাম আবার ট্রলারে। মাঝি মোটর চালু করে হাওড়ে ভেসে ভেসে দুপুরের আহার চলে। সাদা ভাতের সঙ্গে আইড় মাছের টলটলে ঝোল। আহ্! কি টেস্ট। ট্রলার চলতে চলতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সারা দিনের তেজোদীপ্ত সূর্যটা রক্তবর্ণ আভা ছড়িয়ে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। ঠিক ভরসন্ধ্যায় সূর্য মামার নীলিমায় মিলিয়ে যাওয়ার চমত্কার দৃশ্য আপনার হাওড় ভ্রমণের পরিপূর্ণতা এনে দেবে নিশ্চিত।

চলেন যাই: মহাখালী ও সায়েদাবাদ থেকে কিশোরগঞ্জগামী নানা পরিবহন চলাচল করে। সেখান থেকে সিএনজিতে মরিচখালী/চামড়াবন্দর/নিকলি বেড়িবাঁধ। বাস ভাড়া পরিবহনভেদে ২২০ থেকে ৪০০ টাকা।

ভ্রমণ তথ্য: অষ্টগ্রাম হাওড় দেখতে হলে আগের রাতেই কিশোরগঞ্জ চলে যাবেন। কারণ কাকডাকা ভোরে ট্রলারে না চড়লে ফেরা যাবে না। শুধু ছাতিরচর দেখতে চাইলে মরিচখালী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সকালে নিকলি গিয়ে ট্রলারে আসা-যাওয়া, ঘোরা সব মিলিয়ে ৩ ঘণ্টায় সেরে ঢাকা ফেরা যাবে। অষ্টগ্রাম রাতে থাকতে হলে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আগেই বুকিং দিয়ে যেতে হবে।

লেখক: মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম।

দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

73026431_499309080801214_5121852103681114112_n
74615407_604237516988756_3060769724364226560_n

Tourplacebd.com